হাই কমোড ব্যবহারে বৈজ্ঞানিক ও শরয়ী নির্দেশনা

আবদুল্লাহ আরমান

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৬, ২০২২

মুহাম্মদের (সা.) ঘনিষ্ঠতম সাহাবি আবু বকরের (রা.) হাত ধরে ৬৩২ সালের ৮ জুন ইসলামি খেলাফতের যাত্রা শুরু হয়। অবশেষে কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক উসমানীয় খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল মজিদের ক্ষমতাচ্যুতির মাধ্যমে ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ বৈশ্বিক খেলাফতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। প্রায় ১৩০০ বছরের এ গৌরবোজ্জ্বল শাসনামলে মুসলিমদের কতৃত্ব ও প্রভাব রাজনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও বিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রে পৃথিবীর দিগদিগন্তে দ্যুতি ছড়িয়েছে। বৈষয়িক সাফল্যের শিখরে উন্নিত আজকের ইউরোপের অগ্রযাত্রার হাতেখড়ি হয়েছে মুসলিম শাসনামলেই।

সেই সময় অমুসলিমদের মাঝেও পোশাক, শিক্ষা, ভাষাগত ক্ষেত্রে মুসলিম সংস্কৃতির লক্ষ্যনীয় প্রভাব ছিল। দ্বীনি চেতনা হ্রাস, রাজনৈতিক পরাজয় ও অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার সাথে সাথে মুসলিমরা আজ সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাও হারাতে বসেছে। তথাকথিত আধুনিকতা ও পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে আমরা এতটাই পর্যদুস্ত যে, অপসংস্কৃতি চেনার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছি। ভালো-মন্দ যাচাই ছাড়া পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ যেন মুহাম্মদের (স.) বাণীরই প্রতিচ্ছবি। আবূ সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে মারফূ হিসেবে বর্ণিত, “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেদের রীতি-নীতির অনুসরণ করবে। যেমন এক পালক অন্য পালকের সমান হয়। এমনকি তারা যদি দব্ব (গুইসাঁপ সদৃশ প্রাণী) গর্তে প্রবেশ করে, তাহলে তোমরাও প্রবেশ করবে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল, এরা কি ইহুদি ও নাসারা? তিনি বললেন, তারা ছাড়া আর কারা? (মুত্তাফাকুন আলাইহি। বুখারি ৭৩২০)

স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলামের নিজস্ব সামাজিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক রীতিনীতি, অর্থনৈতিক নির্দেশনা ও রাজনৈতিক মূলনীতি রয়েছে। তবে পার্থিব জীবনে চলার পথে ভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির যে সকল ইতিবাচক উপকরণ, প্রযুক্তি ও জীবনাচরণ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন কিছু  গ্রহণ করতে ইসলাম নিষেধ করে না। কিন্তু ইতিবাচক সংস্কৃতি বিনিময়ের ক্ষেত্রে ইসলামের এই উদারতাকে আমরা প্রতিনিয়ত অপব্যবহার করছি। বুঝে কিংবা না বুঝে নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ধীরে ধীরে আমরা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নীরব বাহকে পরিণত হয়েছি। শরীয়াহ, নৈতিকতা ও উপকারিতার মানদণ্ডে উন্নীত না হলেও আমরা পশ্চিমা অভ্যাস ও রীতিনীতির মাঝেই তথাকথিত আধুনিকতা খুঁজে পাই। ফলশ্রুতিতে পশ্চিমা সমাজের সমস্যাগুলোও ধীরে ধীরে আমাদের সমাজে অনুপ্রবেশ করছে।



পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা ইসলামের অপরিহার্য অংশ। মুহাম্মদ (সা.) পবিত্রতাকে ঈমানের অর্ধেক হিসেবে উল্লেখ করেছেন (সহীহ মুসলিম ৪২২)। সকল হাদিসের কিতাবে ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়ে শৌচকার্য ও পয়ঃনিস্কাশনের মৌলিক নীতিমালা এবং শিষ্টাচারিতা সবিস্তারে  আলোচিত হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত নীতিমালা অনুযায়ী আধুনিক শৌচাগার ও তার ব্যবহার পদ্ধতি নিঃসন্দেহে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে সহায়ক ও পরিপূরক।

শৌচাগারের ধরণ ও ব্যবহারের রীতি একেক দেশে একেক রকম। এখন শৌচাগারকে কেবলমাত্র প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের স্থান হিসেবেই বিবেচনা করা হয় না বরং তা রুচিবোধ, আভিজাত্য ও সামাজিক স্ট্যাটাস নির্ণয়ের অন্যতম মানদণ্ডও বটে। তাই আভিজাত্য, বিলাসিতা ও ব্যবহারের সুবিধা বাড়াতে শৌচাগার সামগ্রী প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে। কিন্তু সেগুলোর ব্যবহার শারীরিক সুস্থতার মানদণ্ডে উন্নীত কিনা সচেতন মানুষ হিসেবে তা যাচাই করা অতীব প্রয়োজন।

বর্তমানে আধুনিক শৌচাগারে মূলত দুই ধরনের কমোড ব্যবহার করা হয়। পশ্চিমা হাই কমোড ও স্কোয়াট তথা সমতল মেঝের লো-কমোড। ভারতীয় উপমহাদেশে লো-কমোডের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। তবে শহরকেন্দ্রিক হাই কমোডের ব্যবহার ও চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ বহু আগে থেকেই স্বাস্থ্যগত দিক থেকে নানা অপকারিতার কারণে চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ হাই কমোড ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে আসছে।

মলত্যাগের জন্য সমতল মাটি কিংবা নিচু কমোডে উবু হয়ে বসার অভ্যাস ও প্রথা যুগযুগ ধরে চলে আসছে। বসার এই স্বাভাবিক পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য, পাইলস, ফিস্টুলা ও অন্ত্রের ক্যানসারসহ নানাবিধ রোগ ও রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলের মানুষ হেমোরয়েডস, অন্ত্রের প্রদাহ, কোলন ক্যানসার, পেলভিক ক্যানসার, মলত্যাগে সমস্যা ইত্যাদি রোগে বেশি আক্রান্ত। এর একটি কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছে প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য আধুনিক বসার পদ্ধতিকে বা উঁচু কমোডে বসার পদ্ধতিকে। দেশি লো-কমোড টয়লেটে বসার ভঙ্গিকেই স্বাভাবিক বলছে গবেষকরা। হাই কমোডে বসার ভঙ্গিটি তাদের কাছে মোটেও স্বাভাবিক নয়।

মলত্যাগের জন্য হাইকমোড ব্যবহার করলে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে উঠে আসে ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জার্নালে প্রকাশিত হওয়া এক গবেষণায়। গবেষণাটি ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত তেহরানের ১০০ জন কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর তথ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। মলত্যাগে হাইকমোডের ব্যবহার কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান হাবিবুল্লাহ তালুকদার বলেন, “এই বিষয়ে এখনো সেভাবে কোনো গবেষণা না থাকলেও মলত্যাগের পদ্ধতির সঙ্গে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের ধারণা, হাইকমোডে বসে মলত্যাগ করলে মলাশয় পুরোপুরি পরিষ্কার হয় না। প্রয়োজনীয় চাপ না পড়ায় মলদ্বারে কিছুটা মল থেকে যায়। আর মলে অসংখ্য জীবাণু থাকে, আর সেই জীবাণু সেখানে থেকে যাওয়ায় কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। (দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ ১ সেপ্টেম্বর ২০২০)

বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাবের কোঅর্ডিনেটর ডা. মনিরুজ্জামানের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মানুষ নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করতে সমসাময়িক বিষয়ের সঙ্গে তাল মিলায়। হাজার বছর আগে থেকে মানুষ উঁবু হয়ে বসেই মলত্যাগ করছে। এরপর রোগজীবাণু প্রতিরোধে প্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। হাই কমোড সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, দেখতে আধুনিক এবং সুবিধাজনক মনে হলেও এটা অবৈজ্ঞানিক। হাই কমোড ব্যবহার করলে পেরিনিয়াল রিজিউনের মাংসপেশি ঠিকমতো কাজ করে না। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য, পাইলস, হেমোরয়েডসের মতো রোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়। হাই কমোড ব্যবহার নারীদের নরমাল ডেলিভারি বাধাগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। এই কমোড ব্যবহারের কারণে হাঁটুর পেশির সমস্যা ও ব্যথায় ভুগতে হচ্ছে মানুষকে।

আমেরিকান কলেজ অব গ্যাসট্রোএন্ট্রোলজির পরিসংখ্যান মতে, বয়স ৫০ হওয়ার আগে আমেরিকার অর্ধেক মানুষ হেমোরয়েডসে ভুগতে শুরু করে। কারণ হাই কমোডের ব্যবহার।
গ্যাসট্রোএন্টোলজির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বই ‘বোকাস গ্যাস্ট্রোএন্টোলজি’তে বলা হয়েছে, পেটের সঙ্গে দুই উরু মলত্যাগের সময় লেগে থাকবে। প্যানে বসলে মলদ্বার ও রেকটামের মাঝের অ্যাঙ্গেল থেকে ১২৬ ডিগ্রি। কমোডে বসলে এ দূরত্ব কমে দাঁড়ায় ১০০ ডিগ্রি। প্যানে বসলে টক্সিকসহ অন্যান্য বর্জ্য ঠিকমতো বের হয়, যা কমোডে যায় না।

মলত্যাগে সঠিকভাবে বসার অভ্যাস অর্থাৎ প্যান ব্যবহার করতে হবে। ব্লাডার খালি করে দিতে উঁবু হয়ে বসা বেশ ভালো। বিশেষত নারীদের প্রস্রাব সঠিকভাবে নিঃসরণ হয় এভাবে বসলে। উঁচু কমোডে বসলে ব্লাডার পুরোপুরি খালি হয় না। প্রস্রাব থেকে যায় এবং ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, যা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন সৃষ্টি করে। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ ডিসেম্বর ২০২১)।

ডক্টর বারকোসিকিরোভ বলেন, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের সঙ্গে উঁচু কমোডে বসার সরাসরি যোগ রয়েছে। অধিকাংশ হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক বাথরুমে হয়। গবেষকরা ধারণা করছেন, চাপ দিয়ে মলত্যাগের জন্য এই সমস্যা হয়। (ntv.bd, ৪ অক্টোবর ২০১৫)

গবেষকদের কাছে লো-কমোড নানাদিক থেকে হাই-কমোডের চেয়ে উপকারী। হজম শক্তি বৃদ্ধি, অধিক পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত, গর্ভবতী নারীর জন্য নিরাপদ, শিশুদের ব্যবহার উপযোগী ও রোগব্যাধির সম্ভাবনা হ্রাস ইত্যাদির পাশাপাশি লো-কমোডের বহুবিধ উপকারিতা আছে। অনেকে এই পদ্ধতির আসন গ্রহণকে উপকারী ব্যায়াম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাই কমোড ব্যবহারে অধিক টিস্যু ও ফ্লাশে অতিরিক্ত পানির ব্যবহার হওয়ায় তা লো-কমোডের তুলনায় কম পরিবেশবান্ধব।

জীবনঘনিষ্ঠ জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিটি বিষয়েই ইসলামের নির্দেশনা পাওয়া যায়। এ বিষয়টিও তার ব্যতীক্রম নয়। মুহাম্মদের (স.) বাণী ও জীবনাচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে শৌচকার্যের আসন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। রাসুল (স.) যখন পেশাব-পায়খানার ইচ্ছা করতেন, জমিনের নিকটবর্তী না হওয়া পর্যন্ত তিনি কাপড় ওঠাতেন না। (আবু দাউদ ১৪)। রাসূল (সা.) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, যখন আমাদের কেউ টয়লেটে প্রবেশ করে সে যেন তার বাম পায়ের ওপর ভর দিয়ে বসে এবং ডান পা (স্বাভাবিকভাবে) খাড়া রাখে। (আস সুনানুল কাবীর লিল বায়হাকি। হাদীসটি সনদগতভাবে দুর্বল)

উপরোক্ত দুটি হাদিস দ্বারা সহজেই স্পষ্ট হয়, রাসূল (সা.) সমতল জমিনে উঁবু হয়ে বসতেন। সুতরাং লো-কমোডে বসা সুন্নাতে নববির অধিক নিকটবর্তী। শরয়ীভাবে হাই-কমোড ব্যবহারের হুকুম সম্পর্কে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং ইসলামি ফিকহ একাডেমি, ভারতের সাধারণ সম্পাদক ও বিখ্যাত হানাফি স্কলার খালিদ সাইফুল্লাহ রাহমানী বলেছেন, বাথরুমে হাই কমোড বানানো তাদের জন্য জায়েজ যাদের বসে প্রস্রাব পায়খানা কষ্টকর। এমনিতে ফ্যাশন স্বরূপ এমনটি করা মাকরুহে তাহরীমী। প্রয়োজন ছাড়া হাই কমোড বানানো উচিত নয়। (জাদিদ ফিক্বহী মাসায়েল-১/৫৭)

হানাফি মাযহাবের প্রাণকেন্দ্র দারুল উলূম দেওবন্দের দারুল-ইফতাও অনুরূপ ফতোয়া দিয়ে বলেছে, It is better not to use high commode toilet as it generally carries the possibility of smearing impurity or impure splashes। (Fatwa: 547/496/M=5/1438) ভাবার্থ: হাই-কমোড ব্যবহার না করাই উত্তম। কেননা এটি ব্যবহারে নাপাকি কিংবা নাপাক পানির ফোঁটা শরীরে লাগার অধিক সম্ভাবনা রয়েছে।

হাই-কমোডে পুরুষদের দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে হয় যা নিঃসন্দেহে সুন্নাতের বিপরীত ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে সকল বিদ্বান এ বিষয়ে একমত শারীরিক জটিলতা, অপারগতা, ডাক্তারের পরামর্শ কিংবা ভিন্ন উপায় না থাকলে তখন হাই কমোড ব্যবহার করা যাবে। ঈমান ও শরীরের ক্ষতি হয় এমন প্রতিটি কাজ পরিত্যাগ করা মুসলিমের জন্য আবশ্যক। সুতরাং একজন সচেতন মুসলিম ও স্বাস্থ্য সচেতন  মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্নাহ গ্রহণ ও ক্ষতিকর সবকিছু পরিত্যাগ করা।