
সাদ রহমানের কলাম ‘মণিপুরের সহিংসতা ও বাংলাদেশ’
প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৪
মণিপুরের সহিংস সংঘাতকে কেন্দ্র কইরা আমাদের বাংলাদেশিদের মনে একধরনের নাড়া তৈরি হইছে। সেকথা বিবেচনা কইরা এই লেখায় হাত দিলাম। এই নাড়ার পেছনের কারণ সহজেই অনুমেয়, বাংলাদেশের উপরে ভারতের আধিপত্যবাদের একটা জবাব বাংলাদেশিরা সেভেন সিস্টার্সের বিচ্ছিন্নতাবাদগুলোকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়া দিতে চায়। এইটা ওপেন সিক্রেট, বাংলাদেশিরা স্যোশাল মিডিয়ায় এই ব্যাপারে তেমন কোনো রাখঢাক রাখতে চায় না। ফলে আমারও রাখঢাক করার দরকার নাই।
সেভেন সিস্টার্সের ব্যাপারে ভারত রাষ্ট্রের এবং বৃহৎ ভারতীয় পিপলের জানাশোনা নিতান্তই কম। সেভেন সিস্টার্সের মানুষেরা নামেই শুধু ভারতীয়, অধিকার ও অংশগ্রহণের প্রশ্নে ভারত রাষ্ট্রে তাদের একটা অলিখিত অনধিকার আছে। ভারতের মানুষ এইটা নিয়া চিন্তিত নয়। ফলে আমরা বাংলাদেশিরা যদি এইটা নিয়া চিন্তিত হই, তাতে তাদের ভালো হইলেও হইতে পারে। সম্প্রতি ভারতে মণিপুরের সংঘাত নতুন কইরা মাত্রা পাইছে। বাংলাদেশিরা তাতে মণিপুরের পাশে দাঁড়াইতেছে, সংহতি জানাইতেছে, কিছুক্ষেত্রে তাদের ‘স্বাধীনতাকামীতা’কেও স্যালুট জানাইতেছে।
সহমর্মিতার দিক থেকে বাংলাদেশিদের এই সংহতিকে অ্যাপ্রিশিয়েট করতে হবে। এবং মণিপুরের মানুষজনও নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষদের মনোভাবের ব্যাপারে একটা ধারণা অলরেডি রাখতে শুরু করছে। তবে বাস্তবতা হইলা, মণিপুর বিষয়ে বাংলাদেশের সংহতিদাতাদের সেই অর্থে ভালো জানাশোনা নাই। মণিপুরে আসলেই স্বাধীনতা সংগ্রাম হচ্ছে কিনা এই ব্যাপারে বাংলাদেশিদের অজ্ঞতা আছে, তা থাকা স্বাভাবিকও। ফলে, বলা চলে অনেকটা ঝোঁকের ভিতরেই বাংলাদেশিরা এই সংহতি-কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতেছে।
মণিপুরে আসলে কী ঘটতেছে, ক্যানো ঘটতেছে তার ব্যাপারে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়ার জন্যই আমার এই লেখা। মণিপুরের সংকটটা নাগাল্যান্ড বা মিজোরামের মতো নয়। এইটা ভিন্নতর। ফলে মণিপুরের সংকটকে মোটাদাগে স্বাধীনতাকামী সংঘাত বলা যাবে না। বরং এইটা ভারত রাষ্ট্রের ইন্টারনাল সিভিল সংকট। যা অলরেডি একটা সিভিল ওয়ারের দিকে গড়াইছে বা গড়াইতেছে। এখনো এইটা কমিউনাল ক্ল্যাশ পর্যায়ে আছে। স্বাধীনতাকামীতার সঙ্গে এই সংকটের যোগাযোগ ওইটুকুই, যে, ভারত রাষ্ট্র সেভেন সিস্টার্সের প্রতি চিরকাল হস্টাইল ছিলো, তার ফলে মণিপুরেরও বিপুল সংখ্যক মানুষ ভারতকে তার অধিকারের রাষ্ট্র মনে করে না।
মণিপুরের সমস্যা কী নিয়া
মণিপুরের প্রকৃত মালিক কে? এই সমস্যাজনক ঐতিহাসিক প্রশ্নটা দিয়াই শুরু করি। মণিপুর ইন্ডিয়া-মায়ানমার সীমান্তের একটা রাজ্য। তার পূর্ব এবং পূর্ব-দক্ষিণে মায়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত আছে। তার উত্তরে আছে নাগাল্যান্ড, পশ্চিমে আছে আসাম, আর দক্ষিণে মিজোরাম। মণিপুরের সব নাগরিকই এথনিক বা জাতিগত সম্প্রদায়ের মানুষ। এই মানুষেরা মোটাদাগে তিনটা ভিন্ন জাতিসত্তা থেকে বিলং করে। কুকি, নাগা, এবং মৈতৈ। মণিপুরের বর্তমান সংঘাত এবং এর আগে যত সংঘাত হইছে, সবই হইছে এই তিনটা সম্প্রদায়ের ভিতরকার অধিকার, ক্ষমতা ও সম্পদের বণ্টন ঠিকঠাকভাবে না হওয়ার ফলে।
নব্বুইয়ের দশকে কুকি ও নাগাদের মধ্যে অনেকবার সংঘাত হইছে। এখন যেইটা হইতেছে সেটা কুকি ও মৈতৈদের মধ্যে। এই সংঘাতে নাগা সম্প্রদায় টেকনিক্যালি বা কৌশলগতভাবে কুকিদের পক্ষে থাকতেছে। কারণ, বর্তমানে যেই সংঘাত চলতেছে সেটা হইতেছে পাহাড় বনাম উপত্যকার সংঘাত। এর আগে কুকি বনাম নাগাদের লড়াই ছিলো পাহাড়িদের সঙ্গে পাহাড়িদের লড়াই, মানে নিজেদের সঙ্গে নিজেদের লড়াই। সেই ছদ্ম লড়াই শেষ হইয়া এখন বলা যায়, মণিপুর তার আসল লড়াইয়ে ফেরত গেছে।
পাহাড় বনাম উপত্যকা
মণিপুরে পাহাড় বনাম উপত্যকার এই লড়াই দীর্ঘ ইতিহাস পর্যন্ত বিস্তৃত। মূলত এই লড়াইটাই মনিপুরের আসল লড়াই বা আসল সংঘাত। কুকি ও নাগা সম্প্রদায় পাহাড়ি এরিয়াগুলোতে থাকে, মৈতৈরা থাকে উপত্যকা অঞ্চলে, বা ভ্যালিতে। ব্রিটিশ আসার আগ পর্যন্ত, মৈতৈরা উপত্যকা এরিয়ায় নিজেদের শাসন নিজেরা করতো, আর পাহাড়ি এরিয়াগুলো ছিলো অজস্র ভিন্ন ভিন্ন ট্রাইবের আবাস, সেখানে শাসন-আইন চলতো ট্রাইবদের স্ব স্ব নিয়মে। ব্রিটিশরা মণিপুরে পুরাপুরি প্রবেশ করার পরে তারা পাহাড় ও উপত্যকার মাঝে ক্লিয়ার ডিসটিংশন ক্রিয়েট করলো, এবং তার ফলে পাহাড়ের মানুষদের মধ্যে উপত্যকার ব্যাপারে নানারকম সাসপিশন তৈরি হইতে থাকলো।
কারণ প্রকারান্তরে তখন তারা শাসিত হইতেছিলো উপত্যকা দিয়া, যেহেতু ব্রিটিশের মূল বন্ধুত্ব ছিল উপত্যকার সঙ্গে। মনিপুরে পাহাড়ি অঞ্চল নব্বুই শতাংশ, অন্যদিকে উপত্যকা মাত্র ১০ শতাংশ। ইন্টারেস্টিংলি, উপত্যকায় যে মৈতৈরা থাকে, জনসংখ্যার দিক থেকে তারা প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে বিস্তৃত পাহাড়ি ৯০ ভাগ অঞ্চলে থাকা কুকি আর নাগারা, মণিপুরের জনসংখ্যায় তারা ৪০ শতংশ। কুকি-নাগাদের তরফ থেকে মণিপুর সংঘাতের মূলকথা হইলো, উপত্যকায় থাকা মৈতৈরা রাষ্ট্রের সকল সুবিধা ভোগ করে। আর মৈতৈদের দিক থেকে তা হইলো, মণিপুরে কুকিরা আদৌ ইনডিজিয়াস বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী নয়, মণিপুর বিলংস টু মৈতৈ, ফলে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধায় চিরকাল এই কর্তৃত্বের প্রকাশ ঘটতে হবে।
মণিপুরের প্রকৃত মালিক কে, মূলত এই প্রশ্নের উপর দাঁড়াইয়া মৈতৈরা কুকিদেরকে রাষ্ট্রাধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে, এবং ক্ষমতা-ইঞ্জিনিয়ারিং করে। কেন্দ্র, অর্থাৎ অতীতে ব্রিটিশ আর এখন দিল্লীর সঙ্গে যোগসাজশের মধ্য দিয়া মণিপুরে মৈতৈ জাতির একটা অধিকার কায়েমের চেষ্টা আছে। আর তার বিরুদ্ধে কুকিদের প্রতিরোধ, বিদ্রোহ বা সশস্ত্র কার্যক্রমের ভিতর দিযা যা হয় আমরা তাকে মণিপুরের স্বাধীনতাকাঙ্ক্ষা হিসাবে পাঠ করি।
মণিপুর কিংডম থেকে মণিপুর রাজ্য
মণিপুর সংঘাতের পিছনে কিছু ঐতিহাসিক ইভেন্ট উল্লেখ করা দরকার। তাতে আল্টিমেটলি সমস্যাগুলো ক্যামন, তার একটা বিস্তৃত চরিত্র বোঝা সম্ভব হবে। মণিপুর কিংডম বইলা যেই জিনিসটা ছিল, তার দৈর্ঘ্য ছিল ১১০০ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত। ব্রিটিশরা এই জিনিসরে মেকলে বইলা ডাকতো। আজকের যেই মণিপুর রাজ্য সেটার কথাই বলতেছি। ইতিহাসে এই মণিপুর কিংডমের রাজনৈতিক গুরুত্বের জায়গাটা হইলো, এইটা পড়ছিলো ইন্ডিয়ার সাম্রাজ্য ও বার্মিজ ডাইনেস্টি, এই দুইয়ের মাঝখানে। ফলে ব্রিটিশরা ইন্ডিয়ায় ঢোকার পরে, বার্মিজ ডাইন্যাস্টির সঙ্গে ব্রিটিশদের টেনশনের ধকলটা এই মণিপুর কিংডমের উপর দিয়া গেছে। এবং ইন্ডিয়ার প্রতি বার্মার বাহাদুরির ধকলটাও এর উপর দিয়া গেছে। বার্মা নানাসময় মণিপুর দখলে রাখছে এবং রাখার চেষ্টা করছে।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু কইরা শেষ পর্যন্ত সময়টায় মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র নামের এক লোক মণিপুর কিংডমের সাংস্কৃতিক আইডেন্টিটি তৈরিতে বিশেষ মনোযোগ দিছিলো। মৈতৈ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র কইরাই ছিল তার এই পরিচয়নির্মাণ। মৈতৈ জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ ইত্যাদিকে কেন্দ্র কইরা। বার্মার দিক থেকে সমস্যাটা তখন মৈতৈ সম্প্রদায় কেন্দ্রিক ছিল না, এইটা ছিল তার ইগোর সমস্যা। ফলশ্রুতিতে, মণিপুর কিংডমের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয় তৈরির সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাপারে বার্মিজ ডাইন্যাস্টির ইগো বড় হইতে থাকে।
ঊনিশ শতকের প্রথমদিকটায় বার্মা মণিপুরে ফ্রিকুয়েন্টলি ইনভ্যাশন চালাইতো। সেই ধারাবাহিকতায় ১৮১৯ সালে আইসা মণিপুরে সাত বছরের একটা লম্বা স্বাধীনতাযুদ্ধ হয় বার্মার বিরুদ্ধে। ১৮২৪ সালে এই স্বাধীনতাযুদ্ধ রূপান্তিরত হয় অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধে। মানে ব্রিটিশরা মণিপুরকে সাহায্য করার জন্য আসে। ফলে বার্মিজদের অপসারণ ঘটে মণিপুরের মাটি থেকে। ১৮২৬ সালে সাত বছরের এই ডেভাস্টেশন সমাপ্ত হয়। ব্রিটিশের সাহায্য নেওয়ার ফলে মণিপুর তখন স্বভাবতই একধরনের সেমি-ব্রিটিশ রুলের ভিতরে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। তাদের রাজ্য তারা নিজেরা চালায় বটে, তবে ব্রিটিশ-পরামর্শের আজ্ঞায়।
এই সেমি-ব্রিটিশ রুলের ভিতরে নানারকম ছন্দপতন ছিল। যারা মণিপুর কিংডমের স্বরাজ চাইতো তাদের তরফে ছোট ছোট অনেক ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাবিপ্লব হইছিলো এই সময়ে। ঊনিশ শতকের শেষ প্রান্তে আইসা এই স্বাধীনতা-আন্দোলনগুলোর পরিমাণ অনেক বাইড়া যাওয়ায়, মণিপুর শেষপর্যন্ত সেমি-ব্রিটিশ রুল থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রুলে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়।
ব্রিটিশ অ্যানেক্সেশন ১৮৯১
১৮৯১ সালে সংঘটিত হয় অ্যাংলো-মণিপুর যুদ্ধ। মানে ব্রিটিশদের সঙ্গে মণিপুরের বিদ্রোহীদের সংঘাত। যেই বিপ্লবীরা ব্রিটিশের ছায়া-রাজাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, অভ্যুত্থান বা ক্যু করতে চাইতো, ১৮৯১ সালে তারা কিছু ব্রিটিশ অফিসারকে হত্যা করে, এবং ব্রিটিশরা তখন সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করে। যুদ্ধে ব্রিটিশরা বিদ্রোহীদেরকে পরাস্ত কইরা পূর্ণাঙ্গভাবে মণিপুরকে কব্জায় নেয়। ব্রিটিশ মণিপুরকে কমপ্লিটলি অ্যানেক্সড করার আগ পর্যন্ত, মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলাতে ট্রাইবের শাসন চলতো। সেই অর্থে তারা উপত্যকার মৈতৈ রাজাদের শাসনের অধীন ছিল না।
কিন্তু ব্রিটিশ অ্যানেক্সেশনের পরে ব্রিটিশরা পাহাড় ও উপত্যকাকে স্পষ্ট রেখায় দুই ভাগে ভাগ করে। উপত্যকায় তাদের পছন্দের মৈতৈ সহচোরদের বসায়। আর পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য ‘মণিপুর স্টেট দরবার’ নামে একটা জিনিস তৈরি করে, যার ভাইস-প্রেসিডেন্ট সরাসরি ব্রিটিশ থেকে হইতো। এই রুলিং পদ্ধতির ফলে, মণিপুরের পাহাড়ি ট্রাইবসমূহ এবং উপত্যকার মৈতৈরা, সকলেই এক শাসনের অধীনে চইলা আসলো। তথাপি সুযোগ সুবিধার দিক থেকে উপত্যকাই আগাইয়া রইলো। নতুন এই কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে পাহাড়ি জনজাতিদের সামনে স্বভাবতই নতুন এক যুদ্ধ আবির্ভূত হইলো। চলমান পাহাড় বনাম উপত্যকার এই যে সংঘাত, ঐতিহাসিক বিবেচেনার দিক থেকে তার সবচেয়ে নোটেবল মোমেন্ট এইটা।
এইখানে একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য আছে। তা হইলো, পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষদের এই নতুন অর্থনৈতিক সংগ্রামের সুযোগে পাহাড়ের ট্রাইবগুলোতে খ্রিষ্টান মিশনারি কার্যক্রম বাইড়া গেল। বৃহত্তর কুকি বা নাগা সম্প্রদায়ের মানুষেরা খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া বাড়াইয়া দিলো। আজকাল আমরা কুকি বা নাগাদেরকে যেই সরল বিচারে খ্রিস্টান বলি, তার পিছনে এই দুঃখের ইতিহাসটাও লেখা আছে। একইভাবে আজকের মণিপুরের সংঘাতের পিছে, হিন্দু বনাম খ্রিস্টান ধর্মযুদ্ধের একটা চেহারাও হাজির আছে।
নেহেরুর ভারত ও মণিপুর
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ইন্ডিয়া ছাড়বার কালে, মণিপুর কিংডম নতুন কইরা স্বাধীনতার স্বাদ পাইছিলো, তারা ইন্ডিয়ার অন্তর্ভুক্ত হইছিলো না। মহারাজা বোধচন্দ্র সিং ছিলেন বিগত ব্রিটিশের রুলিং মনার্ক, তিনি ১৯৪৭ সালে মণিপুরের অটনমি ডিক্লেয়ার করলেন, এবং মণিপুরে কন্সটিটিউশনাল গভমেন্ট গঠিত হইলো। কিন্তু এই দেশ বেশিদিন টিকে নাই। বাধ সাধছিল সেই পুরোনো সমস্যা, পাহাড়ে থাকা নাগা ও কুকি সম্প্রদায়রা এই সিস্টেমে পূর্ণাঙ্গভাবে সমন্বিত হইতেছিল না। আনরেস্ট শুরু হইছিলো নানাপ্রকারে, তখন নেহেরু সাহেবের ইন্ডিয়া বোধচন্দ্র সিংকে ডাইকা নিয়া জোর কইরা ইন্ডিয়ার সঙ্গে মার্জড হইতে তাকে বাধ্য করলো, এবং মণিপুর ইন্ডিয়ার অধীনস্ত হইলো।
কিন্তু নোট করার বিষয় যেটা, মণিপুর বাস্তব অর্থেই অধীনস্ত হইলো ইন্ডিয়ার। সম-অধিকারের ভিত্তিতে সংযুক্ত হইলো না। আজকের ইন্ডিয়ার মানুষ যে মণিপুর সহ সমস্ত সেভেন সিস্টার্সকে সেকেন্ডারি হিসাবে দেখে, তার আরম্ভ হইছিলো নেহেরু সাহেবের হাত দিয়াই। নেহেরুর বহু ভালো কাজের সঙ্গে সঙ্গে এই খারাপ কাজটাও আছে। মণিপুরকে ইন্ডিয়ার সি-টাইপ স্টেটের ‘মর্যাদা’ দেওয়া হইলো, অর্থাৎ রাষ্ট্রের তৃতীয় স্তরের স্টেট করা হইলো মণিপুরকে। এ-টাইপ ছিলো যেই স্টেটগুলা সরাসরি ব্রিটিশ আন্ডারে ছিলো, বি-টাইপ ছিলো যেগুলা সাবেক প্রিন্সলি স্টেট তথা পরোক্ষ শাসনের অধীনে চলতো। আর সি-টাইপ ছিলো সেসব স্টেটের মধ্যেও যেগুলা আবার ছোট বা অগুরুত্বপূর্ণ রিজিয়ন হিসাবে বিবেচিত হইতো।
মণিপুরের মাথা থেকে এই সি-টাইপ স্টেটের বোঝা সরছিলো যদিও, ১৯৭২ সালে আইসা তারা ফুল স্টেইটহুড পায়, কিন্তু ততোদিনে রাষ্ট্রকর্তৃক সিস্টেমেটিক অসাম্যের ভিতরে তারা প্রবেশ কইরা ফেলছিলো। আধুনিক ভারত রাষ্ট্রে সিস্টেমের ভিতর দিয়াই উত্যকার জনগোষ্ঠী এই রাজ্যে তার অওনারশিপ নিশ্চিত করতে চাইলো। সেটার ধারাবাহিকতায় পাহাড়ে ও নানাখানে জটিলতা ও বিদ্রোহগোষ্ঠীগুলাও বাড়তে থাকলো। এমনকি মৈতৈদের নিজেদের মধ্যেও ইন্টারনাল নানা দ্বন্দ্ব সংঘটিত হইতে থাকলো।
১৯৯২ সালে, পাহাড়ে নাগা আর কুকিদের মাঝে বড় সহিংসতা হইছিল, যেখানে মারা গেছিলো এক হাজারের বেশি মানুষ। তার দুই বছরের মাথায় মৈতৈদের সঙ্গে পাঙ্গাল কমিউনিটির সহিংসতায় মারা যায় প্রায় দেড়শো মানুষ। এই পাঙ্গাল কমিউনিটি কিন্তু বাঙালি মুসলমান অরিজিন, যারা এখন মণিপুরি মুসলিম হিসাবে পরিচিত, আঠারো শতকে তাদেরকে নিয়া যাওয়া হইছিলো মণিপুরে। ১৯৯৭-৯৮ সালে কুকি-জমি সহিংসতায় আরো সাড়ে তিনশো মানুষের মৃত্যু হয়। ভারত রাষ্ট্রে নিজেদের অধিকার খুঁজতে খুঁজতে মণিপুরের মানুষদের এই মৃত্যুর বহর অনেক লম্বা।
চলমান সংকটের শুরু যেভাবে
চলমান যেই সংকট মণিপুরে, তা আরম্ভ হয় ২০২৩ সালের ৩ মে হাইকোর্টের একটা আদেশকে কেন্দ্র কইরা। প্রায় দেড় বছর আগে শুরু হওয়া সেই সংঘাত এখনো চলতেছে। মণিপুর হাইকোর্ট সরকারকে নির্দেশ দিছিল দিল্লিতে সুপারিশ পাঠানোর জন্য, যাতে মৈতৈ সম্প্রদায়কে শিডিউল ট্রাইবের কোটা দেওয়া যায়। মৈতৈ বর্তমানে ওবিসি নামে অন্য একটা কোটা পায়, যেটা পিছাইয়া পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য। কিন্তু তাদের ট্রাইব স্বীকৃতি নাই। মণিপুরের ট্রাইব কোটা মূলত পাহাড়িরা পায়, কুকি ও নাগা সম্প্রদায়। তাতে তাদের যে খুব কিছু হয় তেমন না। কিন্তু সেই কোটাতেও আবার উপত্যকার মৈতৈদের ভাগ ঢুকলে তাদের কিছুই আর থাকে না।
এইরকম একটা চিন্তা থেকে হাইকোর্টের ওই আদেশ কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ জইমা থাকা রাগ-ক্ষোভ-হতাশায় অগ্নিসঞ্চার করে। এইটা নিশ্চিত কইরা বলা কঠিন, কে প্রথমে এই সহিংসতা আরম্ভ করছিলো। কুকি বনাম মৈতৈ সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের বিরোধ ও বৈরিতা বিবেচনায় নিয়া বলা যায়, এইটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হইলেও, শুধু এই প্রশ্নের উত্তরের ভিতরে মণিপুর সংঘাতের সমাধান আছে এমন নয়। আজ হোক আর কাল হোক, এই সহিংসতা আরম্ভ হইতোই। হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অল ট্রাইবাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন ইন মনিপুর ATSUM নামের একটা ছাত্রসংগঠন চুরাচান্দপুরের পাহাড়ি এলাকায় একটা পদযাত্রার আয়োজন করছিল। অভিযোগ উঠে যে, সেই পদযাত্রার সময় মৈতৈ কমিউনিটির ওপর একটা হাতবোমা হামলা হয়।
এই হাতবোমা কুকি সম্প্রদায়ের লোকেরা ফেলছিলো নাকি মৈতৈদের নিজেদের কাজ ছিলো, তা নিয়া নানরকম সন্দেহের অবকাশ আছে। বাট মোটাদাগে, এইভাবে এই সংঘাতের আরম্ভ হয়।
এই মুহূর্তে মণিপুর উত্তপ্ত ক্যানো
সম্প্রতি একটা অডিও রেকোর্ড ফাঁস হইছে, যেখানে মণিপুরের চিফ মিনিস্টারকে সহিংসতা লাগানোর জন্য বলতে শোনা গেছে। সেস্পিসিফিক্যালি বোম্বিং করার কথা বলতে শোনা গেছে তাকে। চিফ মিনিস্টার স্বভাবতই উপত্যকার এবং মৈতৈ সম্প্রদায়গত। যদিও এই অডিও ক্লিপের এখনো পুর্ণাঙ্গ ইনভেস্টিগেশন হয় নাই। এই ঘটনা গত মাসের। ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, চলতি মাসের শুরুতে একটা রকেট বোমা পতিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তাতে মণিপুরের সহিংস সংঘাত কয়েক মাস রিলেটিভলি ঠাণ্ডা থাকার পর পুনরায় জাইগা উঠে।
রকেট বোমা ফেলার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই কুকিদের বিরুদ্ধে। কিন্তু একই সঙ্গে এই অভিযোগও উঠতেছে, যে কুকিদের তরফ থেকে এমন হামলা যে হইতে পারে তা নজরদারি করার ক্ষেত্রে মণিপুর পুলিশের বড় গাফিলতি ছিল। তাদের এই গাফিলতি ও চিফ মিনিস্টারের ফাঁসকৃত অডিও কল নানারকম সাসপিশন তৈরি করতেছে। মণিপুরে নিরাপত্তার দায়িত্বে কেন্দ্র কর্তৃক নিয়োজিতদের কাছে রকেট বোমা শনাক্ত করার ভালো যন্ত্র ছিল, কিন্তু তা তারা ব্যবহার করা নাই। যদি ব্যবহার করতো, হামলা হইতো না এবং নতুন কইরাও সমস্যা শুরু হইতো না। ফলে প্রশ্ন উঠতেছে, ভারত সরকার কি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেই সহিংসতা চাইতেছে? এমনটা চাইয়া থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। তারা হয়তো কাঁটা দিয়া কাঁটা তুলতে চায়।
মণিপুরের রকেট বোমা কি বিচ্ছিন্নতাবাদী
উপরে আমার এতক্ষণ আলাপে পর, আপনারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, কুকি-মৈতৈ সংঘাতরে সরলভ বিচারে স্বাধীনতা-সংগ্রাম হিসাবে দেখার সুযোগ নাই। কুকিদের জন্য স্বাধীনতা দ্বিতীয় বা তৃতীয় চয়েজ হইতে পারে, কিছুক্ষেত্রে তারা হয়তো এই চিন্তা একেবারেই করতেছে না। কিন্তু তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ করতেছে, এবং সশস্ত্রতার মধ্য দিয়াই ফায়সালা চাইতেছে। তাদের যেমন বিদ্রোহী সশস্ত্র বাহিনী আছে, মৈতৈ জনগোষ্ঠীরও কিন্তু সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনী আছে। এখন এদের মধ্যে আপনি কাকে আপনি স্বাধীনতাকামী বলবেন? কুকিদের সশস্ত্রতার দাবি তাই সাম্যের, স্বাধীনতার নয়। সোশাল মিডিয়ায় যেই ভাইরাল ভিডিওগুলো আমরা দেখতেছি, মশাল ইত্যাদি হাতে, সেগুলো উপত্যকার ভিডিও। সিভিল প্রোটেস্ট বলা যাইতে পারে এইগুলাকে।
মণিপুর সরকারের কাছে তারা তাদের নিরাপত্তার কনসার্ন জানাইতেছে। ক্যানো রকেট বোমলা হামলা হবে মণিপুরে, তার উত্তর চাইতেছে তারা। নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রীয় ট্রুপস মোতায়েন আছে মণিপুরে, তারা জিগাইতেছে এই ট্রুপস রাইখা কী লাভ যদি কামের কাম কিছুই না হয়। অর্থাৎ এই প্রটেস্টগুলাও স্বাধীনতাকামী প্রটেস্ট নয়। বরং সংলাপকামী সিভিল প্রোটেস্ট। কুকি-মৈতৈ সংকটের সমাধান চাইতেছে মণিপুরের মানুষ।
বাংলাদেশিদের এইখানে যা চাওয়ার আছে
দেড় বছরের সহিংসতায় মণিপুরে দুইশোর বেশি মানুষ মারা গেছে। ষাইট হাজারের বেশি মানুষ ডিসপ্লেসড হইছে। প্রায় দুই হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হইছে। এসব সংখ্যা নেহায়েত তুচ্ছ নয়। আমরা মণিপুরে এই অবস্থার অবসান চাই। ইন্ডিয়া সেভেন সিস্টার্সের সমস্যাকে তার নিজের সমস্যা মনে করে না। সেভেন সিস্টার্সদের ‘বিদ্রোহী’দেরকে তারা চিরকাল শিক্ষা দিতে চায়। মণিপুরের কনফ্লিক্টের সঙ্গে থেকে যেহেতু স্বাধীনতাকামী ইনসারজেন্সির যুক্তিশীল সম্পৃক্ততা কম, ফলে এই কনফ্লিক্টের ব্যাপারে দিল্লীর হেলদোলটা চতুর। তারা এইটারে নিজেদের কাজে ব্যবহার করে।
ফলে মণিপুরের জাতীয় জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হইলে মণিপুর ক্যানো ভারতের রাজ্য হিসাবে থাকবে, এই প্রশ্নটা এবার ধীরে ধীরে তোলা দরকার। মণিপুড়ের পাহাড়ি অঞ্চলের যেই অংশে নাগা সম্প্রদায়ের বসবাস, সেই অংশ নাগাল্যান্ডের বিদ্রোহীদের ঘোষিত ‘নাগালিম’ টেরিটরির ভিতরে পড়ে। অন্যদিকে কুকিদের দক্ষিণাঞ্চল নিয়া তারাও চাইলে আলাদা হওয়ার কথা ভাবতে পারে। এই হুমতিটা তৈরি হওয়া দরকার। কুকিরা মায়ানমারের রিফিউজি, মৈতৈদের ভাত মাইরা খাইতেছে, এইসব ব্লেইম গেইম কইরা চিরজীবন শেষ হবে না। কুকিদেরকে আফিম ব্যবসায়ী বইলা দিয়াও এই যুদ্ধ সমাপ্ত হবে না। এর নিষ্পত্তি করতে হবে। আমরা বাংলাদেশিরা মণিপুরিদের মজলুম বিদ্রোহী এবং একই সঙ্গে শান্তিকামী নাগরিকদের পাশে আছি। আমরা মণিপুরে শান্তি চাই।
লেখক: কবি