উৎপল দত্ত

উৎপল দত্ত

রাহমান চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘নাট‌্যজগ‌তের দিকপাল উৎপল দত্ত’

শেষ পর্ব

প্রকাশিত : মার্চ ০৭, ২০২৫

স‌ত্যিকা‌রের নাট‌্যব‌্যক্তিত্ব কে? যি‌নি হয় নামকরা নাট‌্যকার, না-হয় আলো‌চিত নি‌র্দেশক, না-হ‌লে তু‌খোড় অভিনেতা, কিংবা একজন বি‌শ্লেষণধর্মী নাট‌্যসমা‌লোচক অথবা যার নাট‌্যবিষ‌য়ে অসম্ভব সৃ‌ষ্টিশীল রচনা র‌য়ে‌ছে। যার ম‌ধ্যে এগু‌লোর সবক‌টি আছে তি‌নি হ‌চ্ছেন আরো বড় মা‌পের শ্রদ্ধাভাজন ব‌্যক্তি। কিন্তু যার এস‌বের কিছুই নেই, তি‌নি কী ক‌রে নাট‌্যজগ‌তে সম্মা‌নের আসন পান? এই দে‌শেই সম্ভব। মিলনকা‌ন্তি ব‌লে একজন একটা নাটক না লি‌খেও বাংলা একা‌ডেমীর পদক পান, বাংলা‌দে‌শের প্রায় সব মানমর্যাদা এমনই। একবার তো এক আমলার পিতা কিছু না লি‌খেই সা‌হি‌ত্যে পুরস্কার পে‌লেন আবার বা‌তিল হ‌লো।

বিগত ছাত্র-জনতার আন্দোল‌নের বিরু‌দ্ধে থাকার প‌রেও হঠাৎ এই সরকা‌রের আম‌লে সরকারি প্রতিষ্ঠা‌নের কর্মকর্তা হ‌য়ে কতজন‌কে আস্ফালন ক‌র‌তে দেখা যায়। ভাবখানা তি‌নি ম‌নে হয় একেবা‌রে শিল্পাঙ্গ‌নের চেহারা পা‌ল্টে দে‌বেন। স‌ত্যিকা‌রের স্বাধীন‌চেতা মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠা‌নে চাক‌রি কর‌তে যায় না। য‌দি যায়, বুঝ‌তে হ‌বে তি‌নি স্বাধীনতার মা‌নেই বু‌ঝেন না। নি‌জের মিথ‌্যা আস্ফালন করা‌কেই ম‌নে ক‌রেন স্বাধীনতা।  য‌দি সরকার পরামর্শ চায়, তি‌নি পরামর্শ দিতে পা‌রেন। কিন্তু সরকা‌রের অধীনস্থ কর্মকর্তা হ‌তে তি‌নি কখ‌নোই যাবেন না।

বাংলা‌দে‌শে এখন সংখ‌্যায় খুব কম হ‌লেও অবশ‌্যই ভা‌লো কিছু নাটক লেখা হ‌য়ে‌ছে, অনেকে য‌থেষ্ট ভা‌লো নি‌র্দেশনা দি‌চ্ছে এবং অভিনয়ের মান গত শত‌কের তুলনায় অনেক বৃ‌দ্ধি পে‌য়ে‌ছে। কিন্তু যখন তারাই নি‌জে‌দের বিচার-বি‌বেচনা হা‌রি‌য়ে ফে‌লেন, দুঃখ লা‌গে। নি‌জেরাই নি‌জে‌দের অসম্মানিত ক‌রে ব‌্যক্তি‌কে পূজা দি‌তে ব‌সে যান, নি‌জে‌দের চে‌য়ে অযোগ্য একজন‌কে। মানু‌ষের কা‌জের স‌ঠিক মূল‌্যায়ন না ক‌রে এরা অযথা ফু‌লি‌য়ে ফাঁপিয়ে তো‌লেন। ম‌নে রাখতে হ‌বে, এসব শিল্পচর্চার জগ‌তের অশ‌নি স‌ঙ্কেত। বহু বছর ধ‌রে এই সব ব‌্যক্তিপূজার কার‌ণে নাট‌্যাঙ্গন কলু‌সিত হ‌য়ে‌ছে, প্রচুর মানুষ অন‌্যায় করে পার পে‌য়ে‌ছে।

নাট‌্যজগ‌তে মানু‌ষের চরম অন‌্যায় দে‌খে বহু মহারথী চুপ ক‌রে‌ছিল নি‌জে‌দের স্বা‌র্থে। নাট‌্যাঙ্গ‌নের এসব ঘটনা কি সবার অজানা? তারপ‌রেও কী কার‌ণে যেন প্রচা‌রের দ্বারা বিভ্রান্ত হ‌য়ে কিছু বিশাল মা‌পের ফাঁপা অযোগ্যদের নি‌য়ে সবাই খুব টানাটা‌নি ক‌রেন।

বাংলা‌দে‌শের চুয়ান্ন বছ‌রের শ্রেষ্ঠ নাটক, শ্রেষ্ঠ নি‌র্দেশনা, নাট‌্য বিষয়ক শ্রেষ্ঠ গ‌বেষণা, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ আস‌লে কোনগু‌লো, তার একটা তা‌লিকা কর‌লেই অনেক মানু‌ষের প্রচার-প্রসা‌রের অসারতা ধরা প‌ড়ে যা‌বে। বিরাট নাট‌্য ব‌্যক্তিত্ব কে, এই বিচার হ‌তে পা‌রে নাট‌্যজগ‌তে সাম‌গ্রিকভা‌বে তার অবদান কী তা হি‌সেব ক‌রে। নাট‌্যচর্চা থে‌কে তি‌নি কি শুধু  নি‌জের ব‌্যক্তিত্ব বেচে দু‌ধের সর খে‌য়ে‌ছেন, না‌কি প্রতি‌টি অন‌্যা‌য়ের প্রতিবাদ ক‌রে‌ছেন এটাও দেখ‌তে হ‌বে। যারা পূ‌র্বে দুর্নী‌তিগ্রস্ত‌দের স‌ঙ্গে হাত মি‌লি‌য়ে ছি‌লেন, সব জানার প‌রেও দুর্নী‌তিবাজ‌দের বিরু‌দ্ধে প্রতিবাদ ক‌রেন‌নি দুর্নী‌তিবাজ‌দের স‌ঙ্গে থে‌কে তা‌দের কাছ থে‌কে ব‌্যক্তিগত সু‌বিধা নি‌য়েছেন, এই সব মানুষরা আর যাই করুক, নাট‌্যজগ‌তের কল‌্যাণ কর‌তে পারেন না।

সু‌বিধাবাদী সু‌যোগ সন্ধানি মানুষরা পৃ‌থিবীর কা‌রো মঙ্গল কর‌তে পা‌রেন না, নি‌জের ব‌্যক্তিগত সু‌যোগ সু‌বিধা লাভ ছাড়া। নাট‌্যজগ‌তের ভা‌লো করার ক্ষমতা তাদের নেই। নি‌জের ভালো করার, নি‌জের অহম‌কে সন্তুষ্ট করার জন‌্যও এরা জনগ‌ণের নাম বি‌ক্রি ক‌রে নি‌জের মহত্ত্ব প্রচার কর‌তে চান। কিন্তু এদের চ‌রি‌ত্রে কো‌নো মহত্ত্ব নেই, এরা জনগ‌ণের বন্ধু নন, না নাট‌্যচর্চার। জনগ‌ণের প্রকৃত বন্ধুরা সবসময় জনগ‌ণের স‌ঙ্গেই থা‌কেন, কখ‌নোই দুর্নী‌তিবাজ‌দের স‌ঙ্গে হাত মেলান না। কখ‌নোই দুর্নী‌তিবাজ‌দের প‌ক্ষে কলম ধ‌রেন না।

ক্ষমতাহীন বৃহত্তর জনগণের মি‌ছি‌লে বা সমা‌বে‌শে যা‌কে দেখা যায় না, যে কখ‌নো অন‌্যা‌য়ের প্রতিবাদ কর‌তে এগি‌য়ে আসে না; সেই আর যাই হোক, জনগ‌ণের মঙ্গ‌লের জন‌্য কিছুই কর‌তে পা‌রবে না। বরং নি‌জের নানা ব‌্যর্থতা, আপ‌সের দায় অন্যের কাঁধে চা‌পি‌য়ে দি‌তে চেষ্টা ক‌রবে। তবুও এই সব মানুষরা পূজা পা‌বেই। কারণ কিছু মানুষ অন্ধভা‌বে মানুষ‌কে পূজা ক‌র‌বেই, সে-কার‌ণেই এদে‌শে বিজ্ঞান, গ‌বেষণা, বিশ্লেষণ, বিশ্বমা‌নের সৃ‌ষ্টিশীল কাজ পাওয়া যায় না। এই দেশে যে যা ক‌রে তাই না‌কি একেবা‌রে শ্রেষ্ঠ। কা‌রো কাজই এই দে‌শে সাধারণ নয়, সবই অসাধারণ। গাঁ‌য়ে মা‌নে না, আপ‌নি মোড়ল।

ফ‌লে সর্বত্রই শেষ‌বিচা‌রে গুণ্ডা‌দের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয় এবং দুর্নীতি ক‌রে সু‌বিধা নি‌য়ে ব‌্যক্তিপূজা লাভ করা যায়। কিন্তু জামাল নজরুল ইসলামদের মতন বিশ্ব ব‌রেণ‌্য বিজ্ঞানীদের এখা‌নে জায়গা নেই। এই দুর্ভাগা দে‌শেই চ‌ল্লিশ বছর ধ‌রে বাংলা ভাষায় একটানা বিজ্ঞান সাম‌য়িকী বের হ‌চ্ছে, যা নি‌য়ে মাতামা‌তি হয় না। কারণ আমরা জা‌নিই না, কোনটা‌কে সম্মান দি‌তে হয়; কোনটা নি‌য়ে মাতামা‌তি কর‌তে হয়। সবাই নামি দামি সু‌বিধাবাদী অযোগ্যদের পূজা দি‌য়ে আর সব পূজাররিদের মতন ম‌নে শা‌ন্তি পাই। কিছু মানুষ অবশ‌্য পূজা ক‌রে না, পূজা করার না‌মে নি‌জে‌দের অন‌্য উদ্দেশ‌্য চ‌রিতার্থ করার খেলাটা চা‌লি‌য়ে যায়।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক