
মারুফ ইসলামের কলাম ‘সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে বৈষম্য’
প্রকাশিত : অক্টোবর ০৪, ২০২৪
কয়েক বছর ধরে দেশে যেমন বিসিএসের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিসিএস বিদ্বেষ। দেশে একটি বিশাল শ্রেণিই গড়ে উঠেছে, যারা বিসিএসের পেছনে ছোটা তরুণ প্রজন্মকে একপাল ভেড়া ছাড়া অন্য কিছু মনে করে না। আরেক শ্রেণি আছে যারা কথায় কথায় বলে, ‘উদ্যোক্তা হও উদ্যোক্তা হও। সবাইকেই কেন সরকারি চাকরি করতে হবে বাপু!’ এই দুই শ্রেণির বাইরে তৃতীয় আরেকটি বিস্ময়কর শ্রেণি আছে, যারা বিসিএস পরীক্ষার সার্কুলার কিংবা ফল প্রকাশিত হলেই বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলে, প্রজন্মটার হলো কী! সবাই কেন বিসিএস জ্বরে ভুগছে?
সমস্যার শেকড়ে যাওয়ার অভ্যাস কিংবা ইচ্ছা কোনোটাই যেহেতু আমাদের নেই, তাই এ সমস্যার গোড়া আজও ধরতে পারিনি আমরা। যে দেশের প্রায় সকল মানুষ জ্বরের চিকিৎসা মানেই নাপা বোঝে, যানজটের সমাধান মানেই বোঝে ফ্লাইওভার আর সংস্কার মানে বোঝে তিন মাস পর পর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, তাদের কাছে সমস্যার গভীরে গিয়ে তলিয়ে দেখার অভ্যাস আশা করাটাও তো বাতুলতা। ফলে, প্রজন্ম কেন বিসিএস জ্বরে ভুগছে, তার উত্তর তাঁরা খুঁজে পায় না।
যদি আলাদিনের দৈত্য এসে আপনার সামনে রাজার জীবন আর প্রজার জীবনের মধ্য থেকে একটিকে বেছে নিতে বলে, আপনি নিশ্চয় রাজার জীবনটাই বেছে নেবেন। আমাদের সরকারি চাকরিজীবীদের জীবন অনেকটাই রাজা তৃতীয় চার্লসের জীবনের মতো। ব্রিটেনের রাজপরিবারের সমস্ত বিলাস-ব্যাসন, ঠাটবাটের খরচ যেমন ব্রিটিশ সরকার জোগায় তার কোষাগার থেকে, তেমনি আমাদের দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের যাবতীয় শখ আহ্লাদও মেটায় সরকার।
সরকার এবার আইন করেছে, বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ভবিষ্য তহবিল থেকে সাড়ে ২৭ শতাংশ কর দিতে হবে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের তা দিতে হবে না। তারা থাকবেন করমুক্ত। উপরন্তু সরকার তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে আরও ১৩ শতাংশ মুনাফা দেবে! কীভাবে, কোত্থেকে দেবে, সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে রাজপরিবারের গল্পটা বলে নিই।
বাকিংহাম প্রাসাদ থেকে শুরু করে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রিয় বারমোলার প্রাসাদ— সব মিলিয়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারে প্রাসাদ আছে মোট ২৩টি। এছাড়া অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে রাজপরিবারের মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ৮৬৭ কোটি পাউন্ড। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর এই সম্পদের উত্তরাধিকারী এখন রাজা চার্লস। সেই সঙ্গে রানির দুর্গ, রত্ন, শিল্পকর্ম ও ঘোড়ার খামারের উত্তরাধিকার হয়েছেন তিনি। আর এ সবকিছুই করমুক্ত। এই বিপুল সম্পদের কোনো কর দিতে হয় না তাকে।
আমাদের সরকারি চাকরিজীবীদের ভবিষ্য তহবিলও করমুক্ত। তাদের জীবন রাজা চার্লসের জীবন থেকে কম কিসে? উপরন্তু তাদের ভবিষ্য তহবিলের ওপর যে ১৩ শতাংশ সুদ দিচ্ছে সরকার, সেটি কোথা থেকে দিচ্ছে? বলার অপেক্ষা রাখে না, বেসরকারি চাকরিজীবীদের পকেট কেটেই দিচ্ছে।
সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে যে পর্বত প্রমাণ বৈষম্য রয়েছে, বেসরকারি চাকরিজীবীদের ভবিষ্য তহবিলে করারোপ তার সর্বশেষ উদাহরণ। এছাড়া অনির্ধারিত কাজের সময়সীমা, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা, কাজের চাপ, ছুটির স্বল্পতা ও ন্যায্য ছুটি নিয়ে টালবাহানা, কর্মপরিবেশ অনুকূল না হওয়া, নিয়োগে অস্বচ্ছতা, স্বাস্থ্যবীমা-জীবনবীমা না থাকা, অবসরকালীন পেনশন না থাকা, অন্যায্যভাবে কর্মী ছাঁটাই, অস্বাভাবিক শ্রম শোষণ, সঠিক সময়ে বেতন-বোনাস-পদন্নোতি না দেওয়া ইত্যাদি বৈষম্য তো যুগ যুগ ধরে চলে আসছেই।
আবার চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নিয়ে এতদিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে বাধ্যবাধকতা ছিল না, সেটিও এখন উঠে যাচ্ছে। বেশির ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই এখন বয়সসীমা ৩০ বেঁধে দিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, একটু নামডাকওয়ালা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন চাকরিতে আবেদনের প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ থাকা বাধ্যতামূলক করেছে। যে তরুণটি ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার হবেন কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তা হবেন অথবা মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা হবেন, তার কেন এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ থাকতেই হবে, তা চাকরিপ্রার্থীদের কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না। এ ব্যাপারে নিয়োগদাতাদেরও কোনো ব্যাখ্যা নেই। কার্যত বেসরকারি সেক্টরে যা খুশি তাই চলছে, অথচ দেখার কেউ নেই। সরকারের নেই কোনো মনিটরিং সেল।
সেদিন আফসোস করে এক চাকরিপ্রত্যাশী বলছিলেন, দেশে বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞাপন মানেই যেন বিবিএ-এমবিএ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে এত এত বিষয় পড়ানো হয়, সেগুলোর মূল্য কত? আরবি, ফারসি, উর্দু, সংস্কৃত, পালি, নাটক ও নাট্যতত্ব, শান্তি ও সংঘর্ষ—এ রকম অনেক বিষয় থেকে প্রতি বছর শত শত শিক্ষার্থী পাস করে বের হচ্ছে, তারা কোথায় চাকরি করবে? এদের কোনো জায়গা নেই বেসরকারি সেক্টরে।
কথা হচ্ছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্য পর্যায়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। বয়স ৫০ পেরিয়েছে ভদ্রলোকের। তিনি ধুলোপড়া রেকর্ডের মতো ঘ্যাড়ঘেড়ে গলায় বলছিলেন, বেসরকারি সেক্টরে আপনার বয়স যত বাড়তে থাকবে, আপনি তত অস্পৃশ্য হতে থাকবেন। আপনার বেতন বাড়বে না, পদোন্নতি হবে না, উর্ধ্বতনেরা কাজ গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেবে না। এক সময় আপনি বুঝতে পারবেন, আপনার কোথাও যাওয়ার নেই। আপনি যেন অস্পৃশ্য!
এসবের বিপরীতে সরকারি চাকরিজীবী নামধারী জমিদারপুত্র কিংবা রাজা চার্লসদের চাকরিতে কাজের সময়সীমা নির্ধারিত থাকে। সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা অর্থাৎ দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাউকে কোনোভাবে কাজ করতে দেওয়া হয় না। তাদের চাকরির নিরাপত্তা আছে, যখন তখন চাকরি চলে যাওয়ার ভয় নেই। কাজের চাপ কম। ছুটিছাটার অভাব নেই। চাকরিতে আবেদনের বিষয়গত বাধা নেই, যে কোনো বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে বিসিএসে আবেদন করা যায়। অবসরকালে পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, ইনস্যুরেন্স, আবাসন সুবিধা, মাসের ১ তারিখেই বেতন পাওয়া ইত্যাদি সব ধরনের সুবিধাই আছে। এছাড়া সামাজিক মর্যাদা তো আছেই।
সুতরাং সরকারি ও বেসরকারি চাকরির মধ্যে এত এত বৈষম্য রেখে আপনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম কেন বিসিএস জ্বরে ভুগছে! আপনার লজ্জা করে না?
লেখক: কথাসাহিত্যিক