মারিয়া সালামের গদ্য ‘মৃত্যুর মধ্যেই রয়েছে অমরত্ব’

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৫, ২০২৪

আজ যিশুর জন্মদিন। ঠিক এই সময়টাতে আমি তার মৃত্যু নিয়ে লিখছি। কারণ, যিশুর মৃত্যুর মধ্যেই রয়েছে তার বেঁচে থাকার, অমরত্বের বার্তা।

রোববার সূর্য ওঠার পরপরই যিশু জেগে উঠলেন। মৃত্যুর বা হয়তো আসল অর্থে জরার বিরুদ্ধে যিশুর বা মুক্তচিন্তার বিজয় হলো। পুরাতন জীবনের অবসানের পরে নতুন জীবনের শুরু হলো।

যিশুকে ঠিক কবে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, সে হিসাবে গড়বড় আছে। অনেকের মতে, যিশুকে বুধবার ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। তবে বেশির ভাগেরই মতেই দিনটা ছিল শুক্রবার। চূড়ান্ত বিচার-আচার শেষে সকাল ৯টার দিকে ক্রুশে তোলা হলো তাকে। বিকেল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে তার মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হয়।

এই ছয় বা সাত ঘণ্টা ছিল চরম যন্ত্রণাময়। এই যন্ত্রণার তীব্রতা ভাষায় বর্ণনা করে বোঝানো একদম অসম্ভব। ক্রুশে মানুষ কিভাবে মারা যেত, এই বর্ণনা দেওয়াটা খুবই অমানবিক ও নৃশংস। তবু যিশুর ত্যাগের কথা বুঝাতে এই অপ্রিয় কাজটা করছি। ক্রুশে কিভাবে বা কেন মানুষ মারা যায়?

বৃটিশ ফিজিওলজিস্ট জেরেমি ওয়ার্ডের মতে, শ্বাসকষ্ট, শরীরের তরলের পরিমাণ হ্রাস এবং একাধিক অঙ্গ অকার্যকর হয়ে যাওয়া। ক্রুশবিদ্ধ করা হলে, ব্যক্তির শরীরের ক্ষত থেকে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ তাকে দুর্বল করে তোলে, শরীরে তরলের মাত্রা কমতে থাকে। এ অবস্থায় শরীরের সমস্ত ওজন বাহুর ওপরে পড়লে শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এছাড়া, ক্ষত দিয়ে রক্ত বের হওয়ার কারণে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস কাজ করা বন্ধ করে দেয়, ব্যক্তি শ্বাসকষ্টে মারা যায়।

ক্রুশবিদ্ধকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে পার্সিয়ানরা, সেটা খ্রিস্টপূর্ব ৩০০-৪০০ বছর হবে। এরপর রোমান আমলে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধীদের শাস্তি হিসেবে এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। খাড়া কাঠের ক্রশ ব্যবহার ছিল সপ্রচলিত কৌশল আর দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যুতে কত সময় লাগবে সেটা নির্ভর করতো কীভাবে তাদের ক্রুশবিদ্ধ করা হচ্ছে তার ওপরে।

ক্রুশবিদ্ধকরণের সবচেয়ে গুরুতর পদ্ধতিগুলির মধ্যে একটি ছিল লম্বা ক্রুশে দণ্ডিতের দুই বাহু শরীরের ওপরে সোজা করে কাঁটাবিদ্ধ করা। ওয়ার্ড বলেন, এই অবস্থায় ১০ মিনিট থেকে আধঘণ্টার মধ্যে ব্যক্তি মারা যেত। কারণ এই পরিস্থিতিতে শ্বাস নেওয়া অসম্ভব।

আর দুই পাশে বাহু প্রসারিত করে ক্রুশের ওপর পেরেক ঠেকানো কেউ ২৪ ঘণ্টার বেশি বাঁচতে পারবে না। এক্ষেত্রে সাত ইঞ্চি কাঁটা কব্জি দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো যাতে সেখানকার হাড়গুলি শরীরের ওজনকে সমর্থন করতে পারে। পেরেকটি মধ্যম স্নায়ুকে ছিন্ন করত, যা কেবল প্রচণ্ড ব্যথার কারণই নয় বরং ব্যক্তির হাতকে অবশ করে দিত।

পা ক্রুশের খাড়া অংশে পেরেক দিয়ে এমনভাবে আটকানো হতো যাতে হাঁটু প্রায় ৪৫ ডিগ্রিতে বাঁকানো থাকে। মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার জন্য, জল্লাদরা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পা ভেঙে দিত যাতে তাদের ঊরুর পেশীকে সমর্থন হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ না থাকে। ওয়ার্ডের মতে, পা ভেঙে ফেলা সম্ভবত অপ্রয়োজনীয় ছিল। কারণ সেগুলো অক্ষত থাকলেও তাতে শক্তি কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতো না।

একবার পা ছেড়ে দিলে ওজন বাহুতে স্থানান্তরিত হবে, ধীরে ধীরে কাঁধের সংযোগ ছিন্ন হওয়া শুরু হবে। কনুই ও কব্জি কয়েক মিনিট পরে একই পদ্ধতি অনুসরণ করবে। বাহু ছয় বা সাত ইঞ্চি লম্বা হয়ে যাবে। ভুক্তভোগীর বুক দিয়ে শরীরের ভার বহন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। তার অবিলম্বে শ্বাস নিতে সমস্যা হবে। কারণ, ওজনের কারণে পাঁজরের খাঁচা ওপরে উঠে যাবে।

ওয়ার্ড বলেন, রক্তে অক্সিজেনের অভাবের ফলে টিস্যু ও রক্তনালীগুলির ক্ষতি হবে। যার ফলে রক্ত থেকে তরল ফুসফুস ও হার্টের চারপাশের থলিসহ টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি ফুসফুসকে শক্ত করে শ্বাস-প্রশ্বাসকে আরও কঠিন করে তুলবে এবং হৃদপিণ্ডের চারপাশে চাপ তার পাম্পিংকে ব্যাহত করবে।

এই পুরা সময়টা খুবই বেদনাদায়ক। সাজাপ্রাপ্ত কী পরিমাণ কষ্টের ভেতর দিয়ে যায়, সেটা কারো পক্ষেই কল্পনা করা সম্ভব নয়। বুকে, পাঁজরে আর বাহুতে মনে হয় শত-শত তীর বিঁধে আছে। কেউ যেন হাত দিয়ে টেনে শরীর থেকে পাঁজরগুলো ছিড়ে বের করছে। সাজাপ্রাপ্তরা তীব্র ব্যথায় পুরা সময়টা গোঙাতে থাকে।

এরকম পরিস্থিতিতেও ঈশা সাতবার কথা বলেছিলেন। তাকে যারা এই যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তাদের ব্যাপারে খোদাকে বলেছিলেন, ‘এদের ক্ষমা করো।’ যিশু কোনো সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চাননি, এমনকি নতুন কোনো ধর্মমতও না। উনি মানবতার বাণী প্রচার করেছিলেন, গণমানুষের মুক্তির আন্দোলন করেছিলেন। তাতে করে জরাগ্রস্ত ধর্মান্ধ ইহুদি নেতারা ধর্মের নামে, খোদার নামে তরুণদের বোকা বানিয়ে রাখতে পারছিল না।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুবিধা ভোগ করতে পারছিল না। যিশুর সাজা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। যুগে যুগে ধর্মের নামে এসব হত্যাকাণ্ড হয়ে আসছে। আমাদের দেশেও আধুনিক যুগে বেশকিছু মুক্তচিন্তার মানুষদের ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাতে করে মানবতার বাণী প্রচার কি বন্ধ হয়ে গেছে?

যায়নি, আর সেজন্যই ঈশার পুনরুত্থান হয়েছে। রূপক অর্থে যিশুর বাণী ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে আরো বিপুলভাবে। মানুষের মধ্যে তার চেতনা এমন শক্তভাবে সমূলে ঢুকে গেছে যে যিশু হয়ে উঠেছেন অমর, চিরজীবী, অবিনশ্বর।

আক্ষরিক অর্থে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন, যিশু ক্রুশে মারা যাননি।এরকম কঠিন ধকলের পরে বেঁচে উঠার সম্ভাবনা খুবই কম, সেটা ৫০০০ এ একজন হতে পারে। কিছু তার্কিক মনে করেন, যিশুকে মারা যাবার আগেই ক্রুশ থেকে নামিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। পেশাগত কারণে উনি ছিলেন খুবই সুঠাম দেহের অধিকারী। এরকম শারীরিক অবস্থায় এত দ্রুত মারা যাওয়ার কথা উনার নয়।

আবার অনেকেই মনে করেন, ক্রুশে উঠানোর আগে যেসব সাজা তাকে দেওয়া হয়, তাতেই তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং দুর্বল হয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উনি মারা যান।

তবে চূড়ান্ত কথা হচ্ছে, যিশু মারা যেতে পারেন না। অন্য মানুষের দায়ভার বহন করতে নিজের ওপরে কষ্ট টেনে নেন, তাদের মৃত্যু সহজ কথা নয়। তারা মরতে পারেন না। তারা যুগে-যুগে ফিরে আসেন বিভিন্ন অবতারে।

বড়দিনের শুভেচ্ছা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী