
মতিউর রহমান মল্লিকের ৫ কবিতা
প্রকাশিত : মার্চ ০১, ২০২৫
কবি, সংগীত শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিকের আজ জন্মদিন। ১৯৫০ সালের ১ মার্চ বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ছাড়পত্রের পক্ষ থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে তার রচিত পাঁচটি কবিতা পুনর্মুদ্রণ করা হলো:
একটি হৃদয়
একটি হৃদয় কলির মতো, ওলির মতো,
মেঘনা নদীর পলির মতো।
পাখপাখালির উধাও উধাও ক্লান্ত প্রহর,
উথাল পাথাল ধানসিঁড়ি ঢেউ নিটোল নহর,
সবুজ খামার হাওয়ার খেলায় সুরের বহর;
একটি হৃদয় লতার মতো, লজ্জাবতীর পাতার মতো
অনেক কথকতার মতো।
ঝুমুর ঝুমুর ঝাউয়ের নূপুর দুপুর বেলা
সুদূর প্রদেশ আলোর ঝালর সাগর বেলা
ঝোপঝাড় ও ঝিল জোনাক জোনাক তারার মেলা;
একটি হৃদয় ফুলের মতো, সুরমা নদীর কূলের মতো
বট-পাকুড়ের মূলের মতো।
রাঙামাটির স্বপন সজীব সুখদ পাহাড়,
মন মাতানো নাফ নদীটির এপার ওপার,
তেঁতুলিয়ার একটানা পথ নানান খামার;
একটি হৃদয় মাঠের মতো, পল্লীগাঁয়ের বাটের মতো,
নৌকা বাঁধা ঘাটের মতো
একটি হৃদয় কলির মতো, ওলির মতো,
মেঘনা নদীর পলির মতো।
এই সময়
এই সময় আকাশ খুব বেশি সংক্ষিপ্ত
দেয়াল টপকাতে গেলেই বিঘ্নিত দৃষ্টিরা অন্তরমুখী
গারদের দিকে
অন্তত পাখি দেখলেতো ওই রকমই।
অথচ কথোপকথন ভালোবাসে সে সব বৃক্ষ
দিনানুদিন অপেক্ষমাণ সমস্ত নীল প্রজাপতির জন্যে
কেবল সেই সব ছায়ায় গেলেই
প্রসারিত ও প্রশস্ত খামার এবং ফসলিত সমতল।
দুঃখ এবং যন্ত্রণা উপদেষ্টা হয়ে গেলে যে রকম
ভেসে আসে—
নিসর্গের নিমজ্জন থাকলে পাখা খোলার আগ্রহ জন্মে
বিস্তার ও বিন্যাসের জন্যে জলাশয়কে
নদীর দিকে নিয়ে যাও।
এখন আমার নির্ণিত জলাশয়
এবং নিমগ্নতা সীমান্ত ছিঁড়েছে
আর অন্তরীণতা থেকে উপলব্ধি— এই জলস্রোত
ঢেউ ঢেউ বেজে যেতে লাগলো
তুমুল প্রপাত যার উপমা।
কবি ও কবিতা
কবিতার শব্দ কি সব
অঙ্গ কি তার অমোঘ বিষয়
কবিতার সংজ্ঞা কেবল সন্নিহিত
শরীরের শিল্পকলাই
কবিতার দেহের জন্য
কবি কি দীপ্র মেধার
এতকাল সবকিছু কি বাইরে থাকে?
কবি কি অলংকারের স্বর্ণঈগল
উপমার জালের ভেতর পালক ঝরায়
এবং সে তার ইচ্ছে মতো দেয় না উড়াল দিগন্তরে
কবি কি ডুব দেবে না
ভাবের স্বচ্ছ্ সম্ভাবনায়
শিকড়পন্থী মহান মানুষ
তৃপ্ত রবেই ডালপালাতেই?
নারী কি শুধুই নারী কবির নিকট
নদী কি শুধুই নদী
কবিতার স্বভাব কি তার অঙ্গে বিভোর
নাকি এক হৃদয় আছে
কবিতার গহীন ভেতর।
একজন ফুটবলের কথা
সময়ের লাথি খেতে খেতে
সে এক নিষ্পেষিত ফুটবল
ঢুকে গেল সকালের অফিসে
নির্দিষ্ট ভেতরে
তারপর নির্বাচিত খেলোয়াড়েরা
নির্ঘাত খেলে গেল সর্বান্ত অবধি
প্রত্যেকের পাও ঘুরে ঘুরে
সেই যে ফুটবল নিয়মিত প্রেসে যায়
কোথায় প্রুফ
পরকীয়া শব্দ নিয়ে জপছে এক
রুদ্ধদ্বার সাধক।
পথে নামতেই খেলে তাকে অনিয়ম
খেলে তাকে ক্ষুধার্ত রেলপথ পাথরের সুঁই
নিষ্পিষ্ট স্মৃতি অনিশ্চিত যাত্রা
খেলে তাকে দুপুরের অতন্দ্র অন্ধকার
আর কূটগূঢ় বৈঠকের লাথি
তারে ফেলে দেয় গিফারির মাঠে
তারপর খেলে তাকে শৃগালের লেজ
গোখরার ফণা।
সে এক জর্জরিত ফুটবল
বাজারের লাথি খেয়ে খেয়ে
থলে ভরে দুঃখ নিয়ে ফিরে যায় ‘ভাড়ায়’
ফিরে যায় চুক্তিবদ্ধ চতুর্থ তলায়
তারপর খেলে তাকে
চারকোটি অভিযোগ
খেল তাকে দুর্বিনীত মাসের খরচ
খেলে তাকে দীর্ঘরাত্রির
এক জেগে থাকা।
এই যে নিগৃহীত ফুটবল
সেও একদা মানুষ ছিল
কিংবা অপরাজিত মানুষের অনুপ্রেরণার মতোন।
বৃক্ষের নামতা
তুমি কেবলই না না করো
অথচ বিষয়ের প্রতিটি প্রান্তেই কী
‘না না’-র মতো পতাকা উড়ছে?
তোমাকে আমি বহুবার বলেছি
একটি মরুভূমি দেখলেই
বলে ফেলো না যে—
এখানে আদিগন্ত শূন্যতা
মরুভূমির নিচের পরিপূর্ণতার কথা নাইবা বললাম
আসলে তুমি যেখানে শূন্যতাকে
দেখে নিয়েছো বলে শেষাবধি মুখ ফিরাতে পারলে
ঠিক সেখানে গতকালও উদিত হয়েছিল
নরম নক্ষত্রের অফুরন্ত নীল আকাশ
তুমি কেবলি না না করো
অথচ তোমার ব্যক্তিগত ‘না না’-র দিকে
ফিরে তাকাও না একবারও
একটা বৃক্ষের সমস্ত শরীর জুড়েই হাঁ হাঁ
মূলত এখন তোমার বারবারই
বৃক্ষের নামতা পড়া দরকার।