নতুন রাজনৈতিক দলের জন্য শুভকামনা

কাজী জহিরুল ইসলাম

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৫

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধাক্কায় যখন শেখ হাসিনার মতো দাম্ভিক ফ্যাসিস্ট সরকার পড়ে গেল, শুধু পড়েই গেল না, সদলবলে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলো, তখন এদেশের গণমানুষের স্বপ্নের পারদ অনেক উঁচুতে উঠে যায়। তারা স্বপ্ন দেখে এই তরুণেরাই দেশকে সকল অনৈতিকতা থেকে, দুর্নীতি থেকে, বৈষম্য থেকে বের করে আনবে। কেন তরুণদের ওপর এত প্রত্যাশা, এত ভরসা? কারণ, অতীতের কোনো সরকারই তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।

বিএনপি ও জাতীয় পার্টি তৈরি হয়েছিল কিংস পার্টি হিসেবে, রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে। মুজিবের দুঃশাসন ও জিয়ার ব্যক্তিগত দেশপ্রেম এই দুটি কারণে কিংস পার্টি হলেও বিএনপি কালক্রমে গণমানুষের ভালোবাসা কুড়াতে সক্ষম হয়। এরশাদের লাম্পট্য জানা সত্বেও উত্তরবঙ্গের, বিশেষ করে রংপুরের, মানুষ তাকে ও তার দলকে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু জেলভীতি তাকে ক্রমশ মেরুদণ্ডহীন এক কেঁচোতে পরিণত করে। বারবার ডিগবাজি খেতে খেতে তিনি জাতীয় পার্টিকে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে ভেলকি দেখানো এক সঙয়ে পরিণত করেন।

এরশাদের মৃত্যুর পর রাজতান্ত্রিক পন্থায় তার ভাই দলের প্রধান হন এবং তিনিও ভাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। ক্ষমতার অংশ হয়ে তার দলের নেতাকর্মীরা দেদারসে লুটপাট করে এবং জাতীয় পার্টিকে একটি গণধিকৃত রাজনৈতিক দলে পরিণত করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের চর্চা কখনোই হয়নি। ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ যখন শেখ মুজিবুর রহমান দলটির সভাপতি হন তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের এবং পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়। শেখ মুজিবুর রহমান আমৃত্যু এই দলের প্রধানের পদ ধরে রাখেন, অন্য কেউ এই পদে বসা তো দূরের কথা চিন্তা করাও পাপ, এইরকম একটা অবস্থার সৃষ্টি করেন। তার মৃত্যুর পরে যখন পরিবারের কেউ দেশে ছিলেন না তখন আপদকালীন ঠেকা দেন কেউ কেউ। প্রয়াত মুজিবের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে এলে রাজতান্ত্রিক পন্থায় পিতার আসনে গদীনসীন হন এবং আজ অবধি, ৪৪ বছর ধরে, দলের নেতৃত্ব আর কারো কাছে যাওয়ার কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি।

আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপি তৈরি হয় এবং দলটি ক্রমশ বড়ো হতে থাকে কিন্তু জন্ম থেকে আজ অবধি এই দলের নেতৃত্বেও জিয়া পরিবারের বাইরের কেউ জায়গা পায়নি এবং ভবিষ্যতে পাবে এমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ হচ্ছে শেখ পরিবারের প্রাইভেট কোম্পানি এবং বিএনপি হচ্ছে জিয়া পরিবারের প্রাইভেট কোম্পানি। এই দুই রহমান অ্যান্ড রহমান কোম্পানি বা শেখ জিয়া প্রাইভেট কোম্পানিই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের মালিক।

রাজনীতির মন্দ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি ছোটো ছোটো কম্যুনিস্ট ধারার দলগুলোও। যেমন: এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক ওয়ার্কাস পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল, বুর্জোয়া ধারার কল্যাণ পার্টি এবং বিজেপি ইত্যাদি। এটিই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলগুলো হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক একেকটি প্রাইভেট কোম্পানি, অথচ তারা মুখে গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে জনগণের সঙ্গে ক্রমাগত প্রতারণা করছে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও কম্যুনিস্ট পার্টি ব্যতিক্রম। এই দুটি দল ব্যক্তি নয় আদর্শকেন্দ্রিক।

জামায়াতের আদর্শ এদেশের মাটি ও মানুষের আকাঙ্ক্ষা থেকে অনেকটা বিচ্যুত হওয়ায় সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন তারা আদায় করতে পারেনি। বাঙালি মুসলমান-প্রধান বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি প্রধান উপকরণ ইসলাম, কিন্তু এদেশের মানুষের মননে, চৈতন্যে আছে একুশের চেতনা, প্রভাতফেরি, মুক্তিযুদ্ধ, পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথের গান, বাউল সঙ্গীত, পীর-ফকিরের মাজার, উলুধ্বনি, সংক্রান্তির মেলা আরো কত কী। এগুলোকে ভালোবেসে গ্রহণ করতে না পারলে এদেশের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব হবে নয়। মাটির সংস্কৃতিকে দূরে ঠেলে দিয়ে ইসলামি শাসন ও ধর্মীয় আইন-কানুন আঁকড়ে ধরে থাকলে, তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সততা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

ঠিক এইরকম সময়ে বাংলাদেশে এমন একটি রাজনৈতিক দল দরকার যে দলে গণতন্ত্রের চর্চা থাকবে, সততা থাকবে, দেশপ্রেম থাকবে এবং পাহাড় ও সমতলের মানুষের সংস্কৃতিকে তারা ধারণ করবে, নিজেদের আত্মমর্যাদা ও সংস্কৃতিবোধ প্রতিদিনের জীবনাচারে প্রতিফলিত হবে। বাংলাদেশের অর্ধশতকের ইতিহাসে উত্থিত সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ফ্যাসিস্ট সরকারকে এক ধাক্কায় ফেলে দিয়েছে যে তরুণ প্রজন্ম, তাদের কাছেই এই মুহূর্তে গণমানুষের প্রত্যাশা, তারাই পারবে জন-আকাঙ্ক্ষা মেটাতে, তারাই পারবে মানুষের অন্তরে লালিত স্বপ্নের রাজনৈতিক দল নিয়ে এদেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে।

এই দলকে যিনি নেতৃত্ব দেবেন, তিনি এরই মধ্যে তার সাহস, নির্লোভ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব দেবার দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনবহুল দেশে লক্ষ্য ও ধৈর্য ঠিক রেখে এগিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। কারণ সকলেই পেতে চায়, পেতে চায় এজন্য যে অধিকাংশ মানুষেরই থালা শূন্য। এইরকম খাই খাই দেশের মানুষকে লক্ষ্যে অটুট রাখা দুরূহ কাজ হলেও অসম্ভব নয়। আমরা প্রত্যাশা করবো তরুণদের নেতৃত্বে যে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হচ্ছে সেই দলে পদের জন্য কোন্দল থাকবে না, ভবিষ্যতে তারা গণতান্ত্রিক পন্থায় যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য নেতৃত্বে আসার সুযোগ করে দেবেন, কেউ তার পদ আঁকড়ে পড়ে থাকতে চাইবেন না, যেভাবে নাহিদ মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়েছেন সেভাবে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যে কোনো পদ-পদবী ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকবেন এবং দলের অন্যরাও এই পথ অনুসরণ করবেন। সততা ও নির্লোভ ব্যক্তিত্ব প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই তাদেরকে অর্জন করতে হবে মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসা।

কাজটি আগের দিনের চেয়ে এখন অনেক সহজ। আকাশ সংস্কৃতি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এখন সব সত্য (এবং মিথ্যাও) মুহূর্তের মধ্যেই গ্রামের রান্নাঘর অব্দি পৌঁছে যায়। কোনো কিছুই কেউ আর গোপন করতে পারে না। যদিও প্রচুর মিথ্যা ও প্রপাগাণ্ডাও ছড়ানো হয় কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ জেনে যায়, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা। এই অবাধ তথ্য প্রবাহই এখন ভোটের ও রাজনীতির হিসেবও পাল্টে দেবে যা অনেক বড় দলের নেতারা বুঝতে পারছেন না।

তরুণদের নতুন দলের জন্য শুভকামনা। একটু সময় লাগলেও তোমরা সফল হবেই। তোমাদের সাফল্য দেখার জন্য বেঁচে থাকতে চাই আরও বেশ কিছু কাল।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক এবং জাতিসংঘের সদর দফতরের আয়কর বিভাগের প্রধান