চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবিরের আজ জন্মদিন

ছাড়পত্র ডেস্ক

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৬, ২০২৪

চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবিরের আজ জন্মদিন। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে ১৯৩৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর তার জন্ম। বাবা আবু সাইয়েদ আহমেদ ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। আলমগীর কবির পড়াশোনা করেন হুগলি কলেজিয়েট স্কুলে। পরে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।

ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৪ সালে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে। ১৯৫৮ সালে পদার্থবিদ্যায় অনার্স দিয়েই লন্ডনে চলে যান। সেখানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। একইসঙ্গে লাভ করেন ফলিত গণিতে বিএসসি ডিগ্রি।

এ সময় তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। লন্ডনে বামপন্থী দৈনিক Daily Worker এ রিপোর্টারের কাজ নেন। এর মধ্যে তার সিনেমা বানানোর প্রস্তুতিও চলতে থাকে। এর পরের কয়েক বছর তিনি ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত চলচ্চিত্র ইতিহাস ও পরিচালনা বিষয়ক কয়েকটি কোর্স সম্পন্ন করেন।

তিনি চলচ্চিত্র সমালোচনাকে পেশা হিসেবে নেয়ার চেষ্টা করেন এ সময়ে। ইউরোপের বেশ কয়েকটা দেশের চলচ্চিত্র উৎসবে যোগদান করেন। এসময় তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িতে পড়তে শুরু করেন।

আলমগীর কবির ১৯৬৫ সাল নাগাদ বাম রাজনীতিতে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে প্যালেস্টাইন চলে যান। এছাড়া আলজেরিয়ার মুক্তিসংগ্রামেও তিনি দূত হিসেবে কাজ করেন। এ কারণে ফরাসি সরকারের কোপানলে পড়ে তাকে কয়েক মাস জেলে থাকতে হয়।

ওই সময় লন্ডনের ইস্ট পাকিস্তান হাউজ, ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট ইত্যাদি সংগঠন থেকে পরিচালিত নানা ধরনের আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

দেশে ফিরে আসেন ১৯৬৬ সালে। প্রথমে ইংরেজি পত্রিকা দ্য অবজারভারে, পরে সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে হলিডে ছেড়ে এক্সপ্রেস নামে একটি ট্যাবলয়েড সাপ্তাহিকে জহির রায়হানের সঙ্গে সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

শিগগিরই ঝরঝরে ইংরেজি, দ্রুত ও সাবলীল রিপোর্টিংয়ে সবার নজর কাড়েন। কঠোর ও বিশ্লেষণধর্মী চলচ্চিত্র-সমালোচক হিসেবেও সুপরিচিত হন। প্রয়াত নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুনের ধারাবাহিক নাটক সিরাজ-উদ-দৌলাকে নিয়ে এক্সপ্রেস ট্যাবলয়েডের হেডলাইন ছিল, দি লংগেস্ট বোরিং অন দ্য স্ক্রিন।

এ বিষয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছিলেন, সেদিনই বুঝলাম সর্বোচ্চ ভালো কিছুর স্বার্থে মননশীল সমালোচনা কতটা কাজে আসতে পারে। সীমাবদ্ধতার সঙ্গে কীভাবে যুদ্ধ করতে হয় সেটা শিখেছি আলমগীর কবিরের কাছ থেকে।

ষাটের দশকে চলচ্চিত্র সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি থেকে তিনি সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ পুরস্কার লাভ করেন। এ সময়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অংশ নেয়ায় আইয়ুব সরকারের অধীনে কয়েক মাস তিনি জেলে কাটান। এছাড়া এক বছর ঢাকার পৌর এলাকাতেও অন্তরীণ থাকেন।

দেশে ফেরার পরের বছর রবিবাসরীয় সাপ্তাহিক Holiday পত্রিকাতে ঊর্ধ্বতন সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। চলচ্চিত্রের ভালো কাজের যেমন প্রশংসা করেন, তেমনি দুর্বল কাজের সমালোচনা করেন শক্তভাবে। এর ফলে স্থানীয় বাণিজ্যিক চিত্রনির্মাতাদের কাছ থেকে তিনি নানা হুমকির সম্মুখীন হন।

এ সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র চলচ্চিত্র সংসদ ‘পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি পূর্বপাকিস্তানের চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

নানা জটিলতা ও টানাপোড়েনের ভেতর ‘পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি’ ত্যাগ করে এ বছর নিজের প্রচেষ্টাতে গড়ে তোলেন অপর একটি ফিল্ম সোসাইটি ‘ঢাকা সিনে ক্লাব’। এ বছরেই প্রকাশিত হয় চলচ্চিত্র বিষয়ক তার প্রথম বই Cinema in Pakistan। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তিনি যেসব চিত্র-সমালোচনা লিখেছিলেন, তারই একটা সুসংহত রূপ দেখা যায় এ বইতে।

এখানে তিনি মূলত ইতিহাসের আকারে তৎকালীন পাকিস্তানি চলচ্চিত্র-জগতের বাস্তব অবস্থাকে বিশ্লেষণ করেন। চলচ্চিত্র বিষয়ক জার্নাল Sequenceও এ বছর থেকেই তিনি প্রকাশ করতে শুরু করেন। এ বছর তার আরও একটা প্রধান কাজ ছিল, ঢাকা ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা। এর উদ্দেশ্য ছিল, এ দেশের তরুণ-তরুণীদের আধুনিক চলচ্চিত্রের ভাষা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।

পরে এটি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও আলমগীর কবির বিভিন্নভাবেই এ ধরনের প্রশিক্ষণে জড়িত থেকেছেন। চলচ্চিত্রের হাতেখড়ি হিসেবে তিনি মওলানা ভাসানীর ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্রের কাজ শুরু করেন। এ সময়ে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে প্রকাশ করেন Express নামের একটি পত্রিকা। এ পত্রিকার সঙ্গে আরও যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান, গাজী শাহাবুদ্দিন প্রমুখ।

ত্রৈমাসিক এই পত্রিকাতে তিনি ক্ষুরধার লেখনি আর দক্ষ সম্পাদনার স্বাক্ষর রাখেন। এ জার্নালটি স্বাধীনতার পরও প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পরপরই তিনি যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। তার মূল কাজ ছিল, ইংরেজি বিভাগের জন্য প্রতিবেদন তৈরি করা। এছাড়া বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে আরও নানা ধরনের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন তিনি।

বিদেশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, কূটনীতিবিদ, রাজনীতিবিদদের বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হতো স্বাধীন বাংলা বেতারে। এসব কিছুই হতো তার পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণে। সে-সময়ে তিনি From the War Front নামক একটা অনুষ্ঠানও শুরু করেন। একইসঙ্গে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করতেন ইংরেজি সাপ্তাহিক People এ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’র নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে ‘ধীরে বহে মেঘনা’ মুক্তি পায়। এ ছবির জন্য তিনি বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়াও এ শিল্পের উন্নয়নে তিনি নানারকম কাজ করতে থাকেন। ১৯৭৪ সালে দেশের চলচ্চিত্র সংসদগুলো একত্রিত হয়ে গঠন করে ‘বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ’ এবং আলমগীর কবির এই সংগঠনের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭৬ সালে তার দ্বিতীয় ছবি ‘সূর্যকন্যা’ মুক্তিলাভ করে। এ ছবির জন্যে তিনি বাচসাস, উত্তরণ, বাংলাদেশ চলচ্চিত্রকার সংসদ কর্তৃক একাধিক পুরস্কার লাভ করেন। এরপর ‘সীমানা পেরিয়ে’ মুক্তিলাভ করে। এ ছবির জন্যে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেয়া হয় তাকে। বাচসাস এবং উত্তরণ প্রভৃতি সংগঠন কর্তৃকও এ ছবিটা বেশ কয়েকটি পুরস্কার লাভ করে।

স্থানীয় চলচ্চিত্রে নকলের ব্যাপক প্রবণতা দেখা দিলে সমমনাদের নিয়ে এ বছরই তিনি গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্রকার সংসদ’ যা নকলের বিরুদ্ধে বিশেষ আন্দোলন গড়ে তোলে। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেয়া হয়, তাতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এই সময়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলেন ‘ভিন্টেজ পাবলিকেশন্স’ নামক একটি প্রকাশনাসংস্থা।

১৯৭৯ সালে তার ছবি ‘রূপালী সৈকতে’ মুক্তি লাভ করে। বাচসাস কর্তৃক এ ছবিটিও পুরস্কৃত হয়। ওই বছর তার দুটি বই প্রকাশিত হয়। বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে Film in Bangladesh এবং শিল্পকলা একাডেমি প্রকাশ করে তার প্রথম তিনটি ছবির চিত্রনাট্যের বই ‘চিত্রনাট্য’। এ দেশে চিত্রনাট্যের ওপর এটাই ছিল প্রথম বই।

বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ও ইনস্টিটিউটে চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রশিক্ষণকাজ শুরু হলে তিনি সেই কোর্সের সমন্বয়কারী নিযুক্ত হন এবং প্রশিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন। সেই বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ এর স্মরণিকাও প্রকাশ করেন তিনি।

আলমগীর কবির ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যকার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোকে চার ভাগে ভাগ করেন। যুদ্ধের চলচ্চিত্র, গ্রামীণ চলচ্চিত্র, বিকল্পধারা এবং স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র। সেই হিসেবে তার ধীরে বহে মেঘনা, সীমানা পেরিয়ে এবং সূর্যকন্যা বিকল্পধারার মধ্যে পড়ে। কিন্তু এসব চলচ্চিত্রের কাহিনির বিষয়বস্তু ও নান্দনিকতা জনপরিসরে কৌতূহল-উদ্দীপক। দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত ও সম্ভাবনাময়। সেসব সিনেমার অভিনব ভাষাভঙ্গি সাধারণ মানুষের কানে কিছুটা হলেও পৌঁছেছিল।

খেয়াল করার বিষয়, আলমগীর কবির সীমানা পেরিয়ে সম্পর্কে বলতে গিয়ে চলচ্চিত্রের সঙ্গে বাণিজ্যের সম্পর্ক খোলাসা করেছেন। বড় ক্যানভাসে তৈরি এই চলচ্চিত্রগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয়নি। সেই অর্থে চার ধরনের চলচ্চিত্রের বিভেদরেখাকে মোটাদাগে দেখলে চলবে না।

১৯৮৯ সালে বগুড়া চলচ্চিত্র সংসদ-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পর ঢাকায় ফেরার পথে ২০ জানুয়ারি নগরবাড়ী ফেরিঘাটে তিনি এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথিকৃত আলমগীর কবির। তার হাত দিয়ে এদেশের দর্শক পেয়েছে বেশ কয়েকটি শিল্পরুচিসম্পন্ন সিনেমা। সিনেমার এই কারিগরের জীবন ছিল বহু বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য। একান্ন বছরের কর্মব্যস্ত জীবনে নানা কাজেই তিনি জড়িত ছিলেন। জীবনের নানামুখি বৈচিত্র্য তাকে টেনে নিয়ে গেছে সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, মুক্তিযোদ্ধা, সর্বোপরি দেশ-সমাজ সচেতন একজন কর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির কাতারে।
 
এক জীবনে তিনি লিখেছেন পাঁচটি বই, তৈরি করেছেন ছয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও ডজনখানেক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রকাশ করেছেন একটি ইংরেজি সিনে জার্নাল। তিনি ছিলেন এদেশের প্রথম চলচ্চিত্র-সংসদের ও চলচ্চিত্র-সংসদ ফেডারেশনের সভাপতি। তিনি প্রচলন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক একটি পুরস্কার। আমৃত্যু তিনি রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ে দেশ-বিদেশের জার্নালগুলোতে নানা ধরনের লেখা লিখে গেছেন।