জিয়াউর রহমান

জিয়াউর রহমান

কীভাবে রচিত হলো ‘একটি জাতির জন্ম’

কাজী জহিরুল ইসলাম

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৫, ২০২৫

নানান উৎস থেকে নিয়মিত রণাঙ্গনের খোঁজ নিতেন দৈনিক বাংলার সিনিয়র সাংবাদিক ফওজুল করিম। দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য, ঝুঁকি, ক্ষয়ক্ষতি, মা-বোনদের নির্যাতনের খবর এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অপারেশনের খবর তো নিতেনই, যেভাবেই হোক সবসময় কমলের হালনাগাদ অবস্থা ও অবস্থানের খোঁজ-খবর রাখতেন তিনি অতি গোপনে। যখনই মনে পড়ত তারই আপন চাচাততো ভাই, কমল, ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন তখনই গর্বে বুকটা উঁচু হয়ে উঠত।

কমল যে ওর চাচাতো ভাই, এ-কথা জানতেন শুধু একজন, দক্ষ রিপোর্টার মনজুর আহমদ। মনজুর আহমদকে তারা ভাই পছন্দ করতেন দুটি কারণে। প্রথমত, তার পেশাগত সততা। দ্বিতীয়ত, তার গল্প লেখার দক্ষতা। একের মধ্যে দুই, সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।

নিউইয়র্কে বসবাসকারী বর্ষীয়ান সাংবাদিক মনজুর আহমদের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি, ইতিহাস ও সংবাদপত্র জগতের নানান খুঁটিনাটি নিয়ে প্রায়শই আমার কথা হয়। আমরা ফোনে দীর্ঘ সময় ধরে গল্প করি। এইসব কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তার ৬ দশকের সাংবাদিকতা জীবনের বহু অভিজ্ঞতার কথা জেনেছি। আজ শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মনজুর আহমদের যোগাযোগের গল্পগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব। তিনিই দৈনিক বাংলা পত্রিকার জন্য ২০ মার্চ ১৯৭২ সালে তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউর রহমানের প্রথম সাক্ষাৎকারটি নেন, যা দৈনিক বাংলার স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায়, ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ, ছাপা হয়।

একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধটিও ছাপা হয়। নাতিদীর্ঘ এই রচনাটি জিয়াউর রহমান লিখেছিলেন মনজুর আহমদ কর্তৃক উদ্বুদ্ধ হয়েই এবং ১৯৭২ সালের ২১ মার্চ সকালে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নিজের অফিসে বসে মনজুর আহমদকে বিদায় দেবার প্রাক্কালে হাতের লেখা পাণ্ডুলিপিটি তার হাতে তুলে দেন।

দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেছে। পুরো দেশ বিজয়ের আনন্দে উত্তাল। সপ্তাহখানেক পরের একদিন। সূর্য ডুবে গেছে। পশ্চিমাকাশের লাল আলোও মিইয়ে গেছে বেশ অনেকক্ষণ আগে। আস্তে আস্তে শীতের অন্ধকার জাপটে ধরছে ঢাকা শহরকে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। হালকা একটি সোয়েটার গায়ে মনজুর আহমদ টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে নিউজপ্রিন্টের প্যাডে রিপোর্ট লিখছেন। ফওজুল করিম, যাকে সবাই তারা ভাই হিসেবেই চেনেন, ছুটতে ছুটতে মনজুর আহমদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ান।

পুরো নব্বই ডিগ্রি ঝুঁকে মুখটা মনজুর আহমদের কানের কাছে এনে বলেন, কমল ফিরে এসেছে। আজই ফিরেছে, দেখা করতে যাব। যাবে নাকি?
মনজুর আহমদ কলমটা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ান, কখন যাবেন?
কাল সকালে। খুব সকালেই যেতে হবে। ও নিশ্চয়ই সকাল সকাল অফিসে চলে যাবে, তার আগেই ওকে ধরতে হবে।
অবশ্যই যাব। কোথায় উঠেছেন?

শান্তিনগরে, ওর বড় ভায়েরা মোজাম্মেল হক সাহেবের বাড়িতে। কাগজ দাও, ঠিকানা লিখে দিচ্ছি, তুমি তোমার মতো চলে এসো। সকাল ৭টার মধ্যে আসবে কিন্তু, নাহলে ওকে পাবে না।

পরদিন সকাল ৭টায় মনজুর আহমদ শান্তিনগরে খালেদা জিয়ার বড় বোন খুরশীদ জাহান হক, যাকে সবাই চকলেট আপা হিসেবেই চেনেন, তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। তারা ভাই আগেই পৌঁছে গেছেন। তারা ভাইয়ের সঙ্গে বসে মনজুর আহমদ যুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে পরিকল্পনা করেছেন, সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এলে দৈনিক বাংলার জন্য তার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেবেন। শান্তিনগরের এই বাড়িটিতে আসতে আসতে সেই দীর্ঘ পরিকল্পিত সাক্ষাৎকারের হাজারো প্রশ্ন মনজুর আহমদের মাথায় কিলবিল করছিল।

ড্রয়িংরুমে বসলেন ওরা। খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না। সামরিক ইউনিফর্ম পরা জিয়াউর রহমান ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। এসেই স্মিত হেসে জিজ্ঞেস করেন, কেমন আছেন তারা ভাই?

তারা ভাই তার স্নেহের কমলকে জড়িয়ে ধরতে গেলে জিয়াউর রহমান তার সামরিক গাম্ভীর্য ঠিক রেখে হাত বাড়িয়ে দেন। হাতটা ধরেই তারা ভাই একেবারে বাংলা সিনেমার সংলাপের মতো বলে ওঠেন, আমি জানতাম কমল, তুমি এটা পারবে।

মনজুর আহমদকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাগজের জন্য ও তোমার একটা সাক্ষাৎকার নেবে।

একজন নিপাট ভদ্রলোক মেজর জিয়া মনজুর আহমদের সঙ্গে করমর্দন করলেন। সোফায় বসলেন। একসঙ্গে চা খেলেন। চা খেতে খেতে মনজুর আহমদ বলেন, আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু জানার আছে আমাদের।

জিয়াউর রহমান বিনয়ের সঙ্গে, অথচ বেশ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, সাংবাদিক সাহেব, এখন নয়। কালই তো মাত্র দেশে এলাম, আগে দেশের পরিস্থিতি বুঝে নেই, আমি বসবো আপনার সঙ্গে, আমারও অনেক কথা বলার আছে, সময় হলেই আমি আপনাকে ডাকবো।

সামরিক গাড়িতে করে ওদের দুজনকে দৈনিক বাংলার অফিসে নামিয়ে দিয়ে জিয়াউর রহমান চলে যান আর্মি হেডকোয়ার্টারে। একথা কমবেশি আমরা সবাই জানি, জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন নির্লোভ, সৎ ও খাঁটি দেশপ্রেমিক সৈনিক, পরে রাষ্ট্রনায়ক।

তার সততার দুয়েকটি দৃষ্টান্ত দিই। যখন তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, `মিট দ্য প্রেস` এর সভা হচ্ছে ঢাকা সেনানিবাসে। মনজুর আহমদ দৈনিক বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে সবসময় প্রেসিডেন্ট বিট কাভার করতেন। তিনিও আছেন সেই মিটিংয়ে।

মিটিং শেষ হয়ে যাবার পর একজন দৌড়ে প্রেসিডেন্টের খুব কাছে চলে আসেন। এসেই বলেন, স্যার আমার প্লটটা নিয়ে খুব ঝামেলা হচ্ছে, আপনি যদি একটু বলে দিতেন।

জিয়াউর রহমান তার দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনার প্লট আছে নাকি? আমার তো প্লট নেই। ব্যাস, ভদ্রলোক যা বোঝার বুঝে গেলেন। এভাবেই তিনি সকল প্রকার তদ্বিরকে নিরুৎসাহিত করতেন।

লে. কর্নেল পদে পদোন্নতি নিয়ে জিয়াউর রহমান যোগ দেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। তিনিই ক্যান্টনমেন্টের জিওসি। আমরা জানি, ক্যান্টনমেন্টের জিওসিরা হন দুই তারকা খচিত জেনারেল বা মেজর জেনারেল কিন্তু তখন যেহেতু লে. কর্নেলের চেয়ে ওপরের অফিসার প্রায় ছিলই না, এই পদমর্যাদার হয়েই মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে, তিনিই জিওসির দায়িত্ব পালন করেন।

এর মধ্যে কেটে যায় প্রায় আড়াই মাস। তারা ভাই ও মনজুর ভাই কিন্তু ভোলেননি তাদের কাঙ্ক্ষিত সাক্ষাৎকারের কথা। দৈনিক বাংলা কর্তৃপক্ষ ঠিক করে, স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধের সমর নায়কদের সাক্ষাৎকার ছাপা হবে। আতাউল গণি ওসমানী, জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ প্রমুখের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই দৈনিকটির জন্য।

মার্চের ১৯ তারিখে বার্তা সম্পাদক ফওজুল করিম ফোন করেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। ওপাশ থেকে জিওসি জিয়াউর রহমান জানান, কালই পাঠিয়ে দিন।

২০ মার্চ, ১৯৭২। বেশ ভোরে বিআরটিসি বাসের টিকিট কেটে উঠে পড়েন মনজুর আহমদ। এবার তিনি একা, সঙ্গী হিসেবে তারা ভাই নেই সাথে। যুদ্ধে বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট। বাসে যাত্রীদের ভিড়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চালকের সহযোগিতায় কোনোরকমে একটা সীট পাওয়া গেল।

এখানে-ওখানে খানাখন্দ। ব্রিজ ভেঙে পড়েছে। দু`বার নৌকায় করে নদী পাড় হতে হলো। শেষমেশ যখন এসে পৌঁছলেন তখন প্রায় বিকেল। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। প্রথমেই একটি রেস্টুরেন্ট খুঁজে পেট পুরে খেয়ে নিলেন। তারপর ক্যান্টনমেন্টে, সোজা কমান্ডারের বাড়িতে। চকলেট আপা তখন ও বাড়িতেই ছিলেন। তিনিই দরোজা খুলে দেন। খালেদা জিয়া এসে অতিথিকে রিসিভ করেন।

জিয়াউর রহমান তখন অফিসে। ফোনে যোগাযোগ হলে প্রথমেই খোঁজ নেন, অতিথির দুপুরের খাওয়া হয়েছে কিনা। মনজুর আহমদ নিশ্চিত করেন, তিনি মাত্রই রেস্টুরেন্ট থেকে পেটপুরে খেয়ে এসেছেন। এরই মধ্যে গাড়ি চলে আসে। মনজুর আহমদকে নিয়ে গাড়ি ছুটে যায় কমান্ডারের অফিসে।

শুরু হয় ইন্টারভিউ। জিয়াউর রহমান বলতে থাকেন তার স্কুলজীবন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান, সেনাবাহিনীতে বাঙালি অফিসার, সৈনিকদের প্রতি পাকিস্তানিদের বৈষম্যের গল্প। একে একে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ করা, নিজের কমান্ডিং অফিসারসহ পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেফতার করা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া।

বিকেল হয়ে গেলে জিয়াউর রহমান বাসায় ফোন করে স্ত্রীকে বলেন, চা-নাশতার ব্যবস্থা করো, আমি মেহমানকে নিয়ে আসছি।

তারা বাসায় আসেন। পাশাপাশি সোফায় দুজনই গা এলিয়ে দেন। খালেদা জিয়া ট্রেতে করে টি-পটে চা, তিনটি কাপ এবং একটি প্লেটে কিছু বিস্কুট নিয়ে আসেন। প্রথমে স্বামীর জন্য এবং অতিথির জন্য দুটো কাপে চা ঢালেন, ওরা নেবার পরে তৃতীয় কাপে চা ঢেলে নিজেও কাপ হাতে নিয়ে অন্য একটি সোফায় বসেন।

হঠাৎ জিয়ার কণ্ঠে কিছুটা উষ্মা। তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে, কিন্তু বিস্কুটের প্লেটের দিকে পিস্তলের নলের মতো আঙুল তাক করে, খানিকটা অনুযুগের সুরে বলেন, এই নাশতা?

খালেদা জিয়া খুব ঘাবড়ে যান, তিনি লাফ দিয়ে উঠেই বলেন, না, না, আরো আসছে, যাচ্ছি আমি।

পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মনজুর আহমদ বলেন, ভাবি, আমি মোটেও ক্ষুধার্ত নই, একটু আগেই পেটভরে ভাত খেয়েছি। এক কাপ চা`ই আসলে দরকার ছিল।

এরপর জিয়াউর রহমানের দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনার যদি লাগে তাহলে ভিন্ন কথা।
জিয়াউর রহমান তখন ঝাঁঝালো কণ্ঠেই বলেন, তাহলে থাক।

বেশ কিছুক্ষণ তিনজনের গল্প, আড্ডা হয়। এরপর আবার গাড়িতে চড়ে ফিরে যান অফিসে। ইন্টারভিউ চলে রাত ১২টা অব্দি। এরই মধ্যে অফিসার্স মেসে মনজুর আহমদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। এক ফাঁকে তারা নৈশভোজও সেরে আসেন। রাত বারোটায় মনজুর আহমদকে অফিসার্স মেসে নামিয়ে দিয়ে বাসায় চলে যান জিয়াউর রহমান।

পরদিন সকালে অফিসার্স মেস থেকে নাশতা করে সাংবাদিক মনজুর আহমদ বিদায় নিতে জিওসির  অফিসে যান। সেখানে আরেক দফা চা খান। এরই মধ্যে সিগন্যালস কোরের একটি গাড়ি ঢাকায় যাবে, সেই গাড়িতে চড়ে মনজুর আহমদের ফেরার ব্যবস্থা করে ফেলেন কমান্ডার।

ঠিক এই সময়ে বেশ কয়েক পৃষ্ঠা হাতের লেখা কাগজ মনজুর আহমদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে লে. কর্নেল জিয়াউর রহমান বলেন, আপনি তো সাংবাদিক মানুষ, লিখবেনই, আমিও একটা লিখেছি। মনজুর আহমদ কাগজের প্রথম পৃষ্ঠার ওপর চোখ রেখে দেখেন, শিরোনাম, ‘একটি জাতির জন্ম’।

সবগুলো পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখেন, কোথাও লেখকের নাম নেই। তখন তিনি বলেন, লিখেছেনই যখন, আপনার নামটাও লিখে দেন। তখন তিনি শেষ পৃষ্ঠায় লিখে দেন, জিয়াউর রহমান।

বেশ দীর্ঘ একটি লেখা। মনজুর আহমদ কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেন, কখন লিখলেন?
তিনি বলেন, আপনাকে নামিয়ে, কাল রাতে।

পাঠক, আপনারা যারা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই লেখাটি পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন, সেখানে লেখা আছে, “পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের সপ্তাহখানেক পরে একজন সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন, সেই দুঃস্বপ্নে ভরা দিনগুলো সম্পর্কে কিছু স্মৃতিকথা লিখতে। আমি একজন সৈনিক। আর লেখা একটি ঈশ্বর প্রদত্ত শিল্প। সৈনিকরা স্বভাবতই সেই বিরল শিল্পক্ষমতার অধিকারী হয় না। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ছিল এমনই আবেগধর্মী যে আমাকেও তখন কিছু লিখতে হয়েছিল। কলম তুলে নিতে হয়েছিল হাতে।”

যে সাংবাদিকের অনুরোধে তিনি এই ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধটি লিখেছিলেন, এটা অনুমান করা অসঙ্গত হবে না, তিনি সাংবাদিক মনজুর আহমদ। তবে জিয়াউর রহমানের চাচাত ভাই সাংবাদিক ফওজুল করিম তারাও হতে পারেন, কেননা কোনো না কোনোভাবে তারা ভাইও জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তবে যেহেতু তিনি সুস্পষ্ট করে বলেছেন, ১৬ ডিসেম্বরের সপ্তাহখানেক পরে একজন সাংবাদিক তাঁকে বলেছিলেন, এবং আমরা জানি ঠিক সেই সময়টাতেই তার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন মনজুর আহমদ, যদিও ফওজুল করিমও সঙ্গে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সাংবাদিক হিসেবে নয়, গিয়েছিলেন ভাই হিসেবে, সেখানে দুই ভাইয়ের আবেগঘন কথাবার্তাই বেশি হয়ে থাকবে, কাজেই এই কৃতিত্ব আমরা মনজুর আহমদকে দিতেই পারি।

জিয়াউর রহমান বলেছেন, ‘আপনাকে নামিয়ে দিয়ে কাল রাতে লিখেছি।’  কিন্তু এই রচনার দ্বিতীয় প্যারাতেই তিনি লিখেছেন, “সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ছিল এমনই আবেগধর্মী যে আমাকেও তখন কিছু লিখতে হয়েছিল। কলম তুলে নিতে হয়েছিল হাতে।” লিখতে হয়েছিল, পাস্ট টেন্সের ক্রিয়াপদটি হয়ত আমাদের বিভ্রান্তিতে ফেলে দিতে পারে। আমি মনে করি, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে যাওয়ার পরে বিভিন্ন সময়ে তিনি এই রচনাটির প্রস্তুতি হিসেবে নোট নিয়েছিলেন বা খসড়া তৈরি করেছিলেন। সেটাকেই বলছেন, “কলম তুলে নিতে হয়েছিল হাতে।”

২০ মার্চ রাত বারোটায় মনজুর আহমদকে নামিয়ে দিয়ে তিনি হয়ত সারারাত জেগে সেই লেখাটা চূড়ান্ত করেন যাতে পরদিন সকালে তা মনজুর আহমদের হাতে তুলে দিতে পারেন।  যারা জিয়াউর রহমানের ‘একটি জাতির জন্ম’ স্মৃচারণমূলক রচনাটি পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, একজন সৈনিক হয়েও তার ভাষাজ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করবার দক্ষতা ছিল। আমি কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, জিয়াউর রহমান বাংলা জানতেন না, এই মন্তব্যটি আমার কাছে সঠিক মনে হয় না। স্কুলজীবন থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানে পড়াশোনা ও চাকরি করার কারণে শিল্পসম্মত প্রমিত বাংলা হয়তো তার শেখা হয়ে ওঠেনি কিন্তু নিজেকে প্রকাশ করার মতো বাংলা তিনি অবশ্যই জানতেন।

এই লেখায় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন, তাকে জাতির জনক ও বঙ্গবন্ধু দুটোই বলেছেন। ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধে কী আছে তার একটু সারসংক্ষেপ উল্লেখ করার আগে মনজুর আহমদের কাছ থেকে শোনা আরেকটি গল্প বলি, এই গল্পেও জিয়াউর রহমানের সততা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে।

জিয়াউর রহমানের একমাত্র বড় ভাই (ছোটো আরও ৩ ভাই ছিলেন) রেজাউর রহমান ছিলেন প্রকৌশলী। তিনি চাকরিসূত্রে পরিবার নিয়ে জাম্বিয়ায় বসবাস করতেন। জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হবার পরে একবার ছুটিতে দেশে আসেন। নিজের ছোট ভাই দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ওঠেন চাচাতো ভাই ফওজুল করিমের বাসায়। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে ক্যান্টনমেন্টে যান এক বিকেলে। ড্রয়িংরুমে অপেক্ষা করছেন রেজাউর রহমান। কিছুক্ষণ পর প্রেসিডেন্ট আসেন। বড় ভাইয়ের সঙ্গে করমর্দন করেন এবং বলেন, আমাকে এক্ষুনি একটা মিটিংয়ে যেতে হচ্ছে, আপনি কিন্তু রাতের খাবার খেয়ে যাবেন। ব্যাস, এইটুকুই। রেজাউর রহমান অবশ্য প্রেসিডেন্টের বাড়িতে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেননি।

পরদিন রেজাউর রহমানকে দৈনিক বাংলা পত্রিকার অফিসে নিয়ে আসেন তারা ভাই। মনজুর আহমদকে বলেন, মনজুর উনার একটা ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে, তোমার তো ব্যাংকে কে যেন পরিচিত আছে, দেখো না সাহায্য করতে পারো কিনা।

মনজুর আহমদ রেজা সাহেবকে নিয়ে ব্যাংকে যান। ফরেন সার্ভিস শাখার প্রধানের সঙ্গে তার সখ্য ছিল। ফরম পূরণ করতে গিয়ে যখন রেজাউর রহমান তার বর্তমান আবাস জাম্বিয়া লেখেন তখন ব্যাংকের অফিসার উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞেস করেন, আপনি জাম্বিয়ায় থাকেন? আমাদের প্রেসিডেন্টের বড় ভাইও তো জাম্বিয়ায় থাকেন, পরিচয় আছে নাকি উনার সাথে? রেজাউর রহমানের ব্যক্তিত্বও জিয়াউর রহমানের মতোই। তিনি এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেন না। কিন্তু মনজুর আহমদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি, তিনি বলেই ফেলেন, ইনিই তিনি, প্রেসিডেন্টের বড় ভাই।

মনজুর ভাই বলেন, কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে যারা কাজটা করছিলেন তাদের মধ্যে একটা দারুণ চাঞ্চল্য তৈরি হলো। কত দ্রুত কাজটা করে দেওয়া যায় তার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। এই ঘটনা এবং এমন বহু ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, স্বভাবগতভাবেই বাঙালি আবেগী, চাটুকার ও ব্যক্তিপূজারী। একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার জন্য যা একটি বড় অন্তরায়।

ফিরে আসি মূল আলোচনায়। জিয়াউর রহমানের এই লেখাটি আবেগে পূর্ণ তবে তা নির্মোহ রচনা। এই আবেগ দেশপ্রেমের আবেগ, নিজেকে মহান করার প্রচেষ্টা এখানে নেই। ১৯৫২ সালে মেট্রিক পাশ করে পাকিস্তান মিলিটেরি একাডেমিতে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেখানে প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করেন বাঙালি ক্যাডেটদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের বৈষম্যমূলক আচরণ। যা দেখে দেখে তার মধ্যে শুধু প্রত্যয়ই তৈরি হয়নি, প্রায়শই মুখের ওপর উচিত কথা শুনিয়ে দিতেন। তিনি ছিলেন মনে-প্রাণে একজন বাঙালি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তার বাঙালি জাতীয়তাবাদের সত্তাকে আরো দৃঢ় ও মজবুত করে।

তিনি লেখেন, “স্কুলজীবন থেকেই পাকিস্তানীদের দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা আমার মনকে পীড়া দিতো।...পাকিস্তানি তরুণ সমাজকে শেখানো হতো বাঙালিদের ঘৃণা করতে।...সেই স্কুলজীবন থেকেই মনে মনে আমার একটা আকাঙ্ক্ষাই লালিত হতো, যদি কখনো দিন আসে, তাহলে এই পাকিস্তানবাদের অস্তিত্বেই আমি আঘাত হানবো।”

দিন এসেছিল এবং তিনি চরম আঘাতটিই হেনেছিলেন। শুধু যে ২৬ মার্চ রাতে `উই রিভল্ট` বলে বিদ্রোহ করেছিলেন তাই নয়। পাকিস্তান মিলিটেরি একাডেমির ক্যাডেট থাকাকালেই স্বজাতির সম্মান রক্ষার্থে অবতীর্ণ হন মুষ্টিযুদ্ধে।

“১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো নির্বাচন। যুক্তফ্রন্টের বিজয় রথের চাকার নিচে পিষ্ট হলো মুসলিম লীগ।...যুক্তফ্রন্টের বিরাট সাফল্যে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে পর্বতে ঘেরা এ্যাবোটাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, আমরা বাঙালি ক্যাডেটরা, আনন্দে হলাম আত্মহারা।...একাডেমির ক্যাফেটারিয়ায় নির্বাচনী বিজয় উৎসব করলাম আমরা। এ-ছিল আমাদের বাংলা ভাষার জয়, এ-ছিল আমাদের অধিকারের জয়, এ-ছিল আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষার জয়, এ-ছিল আমাদের জনগণের, আমাদের দেশের এক বিরাট সাফল্য।

এই সময়েই একদিন কতকগুলো পাকিস্তানি ক্যাডেট আমাদের জাতীয় নেতা ও জাতীয় বীরদের গালাগাল করলো। আখ্যায়িত করলো তাদের বিশ্বাসঘাতক বলে। আমরা প্রতিবাদ করলাম। অবতীর্ণ হলাম তাদের সাথে এক উষ্ণতম কথা কাটাকাটিতে। মুখের কথা কাটাকাটিতে এই বিরোধের মীমাংসা হলো না, ঠিক হলো এর ফয়সালা হবে মুষ্টিযুদ্ধের দ্বন্দ্বে। বাঙালিদের জন্মগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বক্সিং গ্লোভস হাতে তুলে নিলাম আমি। পাকিস্তানি গোয়ার্তুমির মান বাঁচাতে এগিয়ে এলো এক পাকিস্তানি ক্যাডেট। নাম তার লতিফ (পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অর্ডিন্যান্স কোরে এখন সে লেফটেন্যান্ট কর্নেল)। লতিফ প্রতিজ্ঞা করলো, আমাকে সে একটু শিক্ষা দেবে। পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে যাতে আর কথা বলতে না পারি সেই ব্যবস্থা নকি সে করবে।

এই মুষ্টিযুদ্ধ দেখতে সেদিন জমা হয়েছিল অনেক দর্শক। তুমুল করতালির মাঝে শুরু হলো মুষ্টিযুদ্ধ। বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের দুই প্রতিনিধির মধ্যে। লতিফ আর তার পরিষদ দল অকথ্য ভাষায় আমাদের গালাগাল করলো। হুমকি দিলো বহুতর। কিন্তু মুষ্টিযুদ্ধ স্থায়ী হলো না ত্রিশ সেকেন্ডের বেশি। পাকিস্তানপন্থী আমার প্রতিপক্ষ ধুলায় লুটিয়ে পড়লো। আবেদন জানালো, সব বিতর্কের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্যে।”

এই হলো জিয়াউর রহমান। মনে-প্রাণে তিনি ছিলেন একজন বাঙালি, বাংলাদেশি। সৎ, নির্ভীক এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক।

‘একটি জাতির জন্ম’ রচনাটি আমি বেশ কয়েকবার পাঠ করি। পই পই করে খুঁজি স্বাধীনতার ঘোষণা। কিন্তু কোথাও তা নেই। কেন নেই? এর কারণ হতে পারে তার কাছে হয়ত এটি তার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে হয়নি। অথবা যেখানে তিনি লেখাটি শেষ করেছেন, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেয়া, এখানেই শেষ করতে চেয়েছেন। এই বিষয়ে আরো একটু পরে আসছি, তার আগে দেখি বিপ্লবী হয়ে ওঠার জন্য তিনি নিজেকে কীভাবে তৈরি করেছেন।

“সামরিক একাডেমিতে থাকাকালে আমি সম্মুখীন হয়েছি শুধু নিকৃষ্ট অভিজ্ঞতার।...অবৈধ উপায়ে পাকিস্তানীদের দেখেছি বাঙালি ক্যাডেটদের কোণঠাসা করতে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন যেমন, আমি যখন শিক্ষক হলাম তখনো তেমনিভাবেই বাঙালি ক্যাডেটদের ভাগ্যে জুটতো শুধু অবহেলা, অবজ্ঞা আর ঘৃণা। আন্তঃসার্ভিস নির্বাচনী বোর্ডে গ্রহণ করা হতো নিম্নমানের বাঙালি ছেলেদের, ভালো ছেলেদের নেওয়া হতো না ক্যাডেটরূপে। রাজনৈতিক মতাদর্শ আর দরিদ্র পরিবারের নামে প্রত্যাখ্যান করা হতো তাদের। এর সবকিছুই আমাকে ব্যথিত করত। এই সামরিক একাডেমিতেই পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে আমার মন বিদ্রোহ করলো। একাডেমির গ্রন্থাগারে সংগৃহীত ছিল সব বিষয়ের ভালো ভালো বই। আমি জ্ঞানার্জনের এই সুযোগ গ্রহণ করলাম। আমি ব্যাপক পড়াশোনা করলাম ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ সম্পর্কে, বৃটিশ ঐতিহাসিকেরা এটাকে আখ্যায়িত করেছিল বিদ্রোহ হিসেবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা বিদ্রোহ ছিল না, এটা ছিল এক মুক্তিযুদ্ধ।”

এভাবেই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক বীরযোদ্ধা হয়ে ওঠার নৈতিক এবং তাত্বিক প্রস্তুতিটা তৈরি হচ্ছিল সৈনিক জিয়াউর রহমানের। শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন বক্তৃতায় বলতে শুনেছি, জিয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিল না, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দেবে কেমন করে, সে-তো ২৬ মার্চ রাতে বাঙালিদের হত্যা করার জন্য সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু প্রকৃত সত্য জিয়াউর রহমান এই নিবন্ধেই লিখে রেখেছেন। এই রচনার তথ্য নিয়ে সন্দেহ পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, একজন কর্মরত লে. কর্নেলের পক্ষে দেশের প্রধান দৈনিক পত্রিকায় পাঠানো রচনায় মিথ্যা বলার প্রশ্নই ওঠে না, যখন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারেরা সকলেই স্ব স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত এবং সরব। একটি বর্ণ মিথ্যা বললেও সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তখনই হেয় এবং হেনস্থা হবার ঝুঁকি ছিল।

“২৫শে ও ২৬শে মার্চের মধ্যবর্তী কালো রাত। রাত ১টায় আমার কমান্ডিং অফিসার আমাকে নির্দেশ দিলো নৌ-বাহিনীর ট্রাকে করে চট্টগ্রাম বন্দরে যেয়ে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করতে। আমার সাথে নৌ-বাহিনীর (পাকিস্তানি) প্রহরী থাকবে তাও জানানো হলো। আমি ইচ্ছা করলে আমার সাথে তিনজন লোক নিয়ে যেতে পারি। তবে আমার সাথে আমারই ব্যাটেলিয়নের একজন পাকস্তানি অফিসারও থাকবে। অবশ্য কমান্ডিং অফিসারের মতে সে যাবে আমাকে গার্ড দিতেই। এ আদেশ পালন করা আমার পক্ষে ছিল অসম্ভব।

আমরা বন্দরের পথে বেরোলাম। আগ্রাবাদে আমাদের থামতে হলো। পথে ছিল ব্যরিকেড। এই সময়ে সেখানে এলো মেজর খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ক্যাপ্টেন অলি আহমদের কাছ থেকে এ বার্তা এসেছে। আমি রাস্তায় হাঁটছিলাম। খালেক আমাকে একটু দূরে নিয়ে গেল। কানে কানে বলল, তারা ক্যান্টনমেন্ট ও শহরে সামরিক তৎপরতা শুরু করেছে। বহু বাঙালিকে ওরা হত্যা করেছে।

এটা ছিল একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত সময়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি বললাম, আমরা বিদ্রোহ করলাম। তুমি ষোলশহর বাজারে যাও। পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেফতার করো। অলি আহমদকে বলো ব্যাটেলিয়ন তৈরি রাখতে, আমি আসছি। আমি নৌ-বাহিনীর ট্রাকের কাছে ফিরে গেলাম। পাকিস্তানি অফিসার, নৌ-বাহিনীর চীফ পেটি অফিসার ও ড্রাইভারকে জানালাম যে, আমাদের আর বন্দরে যাওয়ার দরকার নেই।

এতে তাদের মনে কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না দেখে আমি পাঞ্জাবি ড্রাইভারকে ট্রাক ঘোরাতে বললাম। ভাগ্য ভালো, সে আমার আদেশ মানলো। আমরা আবার ফিরে চললাম। ষোলশহর বাজারে পৌঁছেই আমি গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে একটা রাইফেল তুলে নিলাম। পাকিস্তানি অফিসারটির দিকে তাক করে বললাম, হাত তোল। আমি তোমাকে গ্রেফতার করলাম। নৌ-বাহিনীর লোকেরা এতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো। এক মুহূর্তের মধ্যেই আমি নৌ-বাহিনীর অফিসারের দিকে রাইফেল তাক করলাম। তারা ছিল আটজন। সবাই আমার নির্দেশ মানলো এবং অস্ত্র ফেলে দিল।

আমি কমান্ডিং অফিসারের জিপ নিয়ে তার বাসার দিকে রওনা দিলাম। তার বাসায় পৌঁছে হাত রাখলাম কলিংবেলে। কমান্ডিং অফিসার পাজামা পরেই বেরিয়ে এলো। খুলে দিল দরজা। ক্ষিপ্রগতিতে আমি ঘরে ঢুকে পড়লাম এবং গলাশুদ্ধ তার কলার টেনে ধরলাম। দ্রুতগতিতে আবার দরজা খুলে কর্নেলকে আমি বাইরে টেনে আনলাম। বললাম, বন্দরে পাঠিয়ে আমাকে মারতে চেয়েছিলে? এই আমি তোমাকে গ্রেফতার করলাম। এখন লক্ষ্মী সোনার মতো আমার সঙ্গে এসো। সে আমার কথা মানলো। আমি তাকে ব্যাটেলিয়নে নিয়ে এলাম। অফিসারদের মেসে যাওয়ার পথে আমি কর্নেল শওকতকে (তখন মেজর) ডাকলাম। তাকে জানালাম, আমরা বিদ্রোহ করেছি। শওকত আমার হাতে হাত মিলালো।

ব্যাটেলিয়নে ফিরে দেখলাম, সমস্ত পাকিস্তানি অফিসারকে বন্দি করে একটা ঘরে রাখা হয়েছে। আমি অফিসে গেলাম।...তারপর রিং করলাম বেসামরিক বিভাগের টেলিফোন অপারেটরকে। তাকে অনুরোধ জানালাম, ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট, কমিশনার, ডিআইজি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাতে যে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটেলিয়ন বিদ্রোহ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করবে তারা।

এদের সবার সাথেই আমি টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাউকেই পাইনি। তাই টেলিফোন অপারেটরের মাধ্যমেই আমি তাদের খবর দিতে চেয়েছিলাম। অপারেটর সানন্দে আমার অনুরোধ রক্ষা করতে রাজি হলো।

...আমি ব্যাটেলিয়নের অফিসার, জেসিও, আর জওয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলাম। তারা সবই জানতো। আমি সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদের নির্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে।...আমি তাদের একটা সামরিক পরিকল্পনা দিলাম। তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ। ১৯৭১ সাল।”

লেখাটি তিনি এখানেই শেষ করেন। পরদিন কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেওয়া এবং পুরোদস্তুর যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আরো কত শত গল্প, সেইসব আর এই রচনায় আসেনি।

যদি ১৯৭২ সালের ২১ মার্চ শহিদ প্রেসিডেন্ট (তৎকালীন লে. কর্নেল) জিয়াউর রহমান তার এই রচনাটি দৈনিক বাংলার রিপোর্টার মনজুর আহমদের হাতে তুলে না দিতেন তাহলে হয়ত এমন একটি ঐতিহাসিক দলিল থেকে বঞ্চিত হত বাংলাদেশের মানুষ। এই রচনাটি মনজুর আহমদের নেওয়া সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি ২৬ মার্চ ১৯৭২ তারিখে দৈনিক বাংলায় ছাপা হয়। ৪ বছর পরে ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যায় সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় লেখাটি পুনঃমুদ্রিত হয়।

হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২০ জানুয়ারি ২০২৫

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক