এলিজা খাতুন

এলিজা খাতুন

এলিজা খাতুনের ১০ কবিতা

প্রকাশিত : মার্চ ০৭, ২০২৫

সহযাত্রী

সম্ভাবনা লুকিয়ে হাসপাতালের ঘুম যত গভীর
স্বপ্নরা তারও বেশি উদ্ভ্রান্ত
যেভাবে মরুর বালু দিশেহারা হয় উটের গতিতে

এই শতকের নষ্ট সময়ে
জীবনের জোয়ার-ভাটায় পতনে-উত্থানে
শীতল উল্লাসে ঘোরাফেরা করছে অন্ধকার

সত্য কবিতা পোড়ানোর মহড়ায়
তাক করা আগ্নেয়াস্ত্রের মালিকের মুখ
ধরা পড়লে, অন্ধকারই পেয়ে যায় বাহবা
খুপড়ির অন্ধকারে ভোর আসার মতো
ইদানীং ইচ্ছের স্রোতে অনিচ্ছারা টানছে বৈঠা

অন্ধকার সময়ের কৃপায়
অসম্ভব না-পাওয়া এতখানি সমুদ্র দেখায়!
ঘুমে-নির্ঘুমে স্বপ্নে
নৈঃশব্দ্যকে সাথে নিয়ে শৈশবের ফ্রক
উড়ে এসে বসে ছায়াচ্ছন্ন শাশ্বত ভাবনার কাঁধে

জীবনের লোভ জীবনেরই অসুখ, আরোগ্যের অর্থ ভিন্ন।
মৃত্যুরশ্মির টান তারও বেশি আন্তরিক নয় কি!

দোলাচল

বহুদূরে তোমার শরীরের প্রগতিকে
স্বাগত জানাতে না চাওয়া একরোখা উদাসীনতায়
ভরে ওঠে মধ্যরাত

নিয়ম করে না হলেও প্রায়শই দেখি, একাকী ভয়ার্ত রাত্রি
জানালার বাইরে থমথমে হাওয়া, নিদ্রামগ্ন নাগরিক সমগ্র
ডাকবাক্সে মরিচার প্রখর জমাটবদ্ধতা

দেখি, দিবসের উন্নয়নকল্পে টলে ওঠা নদীটার
ঝুপঝাপ পাড় ভাঙে অন্ধকারে
বিষের বোতল দেখে ক্ষিপ্র আর্তনাদে কেঁপে ওঠে
বেপারির আগলে রাখা শস্য ও ফলের ঝাঁকা

কথার কার্নিশে দেখা হবার মাশুলস্বরূপ
নৈমিত্তিক ‘শুভ সকাল’ উড়ে এসে
ভোরের মুখ দেখে চেনা প্রতিটি দৃশ্যকেই
সত্য-মিথ্যার দোলাচলে ভরপুর করে তোলে

পথ, প্রকৃতি

প্রতিদিন পৃথিবীর নতুন আর্তনাদ

ঋতুবৈচিত্র্যের প্রতিভা নিয়ে
প্রকৃতি নিজস্ব ডালপালা ছিঁড়েখুঁড়ে ডেকে আনে বিপর্যয়
পথ ও প্রকৃতি খোঁজে তার কাঙ্ক্ষিত পথিক

বিয়োগের সূত্র ধরেই
প্রস্ফুটিত পাপড়ির সৌন্দর্য-ঘ্রাণ
ফসিল হয়ে ওঠে বইয়ের পাতার ভাঁজে

ঘড়ি থেকে সময় খসে গেলে
মানুষের খোঁজে ক্লান্ত হাওয়া
নিজেকে এলিয়ে দেয় গুমোট ঘাসে

সময়ই একমাত্র সূচক, শরীর ছাড়িয়ে মগজ চেনার

স্নায়ুর ঠিকানা পাওয়া গেলেও
অনিশ্চয়তা পায়ে বেঁধে খুঁজতে হয় পথ

কালাক্রান্ত

স্নায়ুর নিভৃত অরণ্যে যেসব আখ্যান
বিষণ্ণতার ঝোপঝাড় হয়ে ছিল
কালের হাওয়া জলে তার বিপুল বিস্তার

পাহাড় কাঁপিয়ে যেভাবে নামছে ধসের মাতম
অন্তরে আঁটোসাঁটো স্থির থাকবে— কী আর এমন দৃঢ়তা!

হারানো পথের অলিগলি ধরে
বিগত দিনপঞ্জি হাতড়ানো সারাবেলা
চলে যাচ্ছে নিজেরই বিপক্ষে; এমন আভাসে—

দলবেঁধে পিছু হটে গেল নতুন সম্ভাবনা
অভিমান ভাঁজ হয়ে সেঁটে গেল নিঃশব্দ নিউরনে

ঐতিহ্যের দেয়ালে ঝুলে থাকা পেন্ডুলামে স্থিরচিত্রকে
একেবারেই কি নির্বাক বলা যাবে!

উদ্ধার করি শালুকপোড়া দুপুর

সমাবেশে মুখে মুখে সজ্জিত শব্দের ঝাপাঝাপি
ব্যানার-বিন্যাসে দর্শন-তত্ত্বের ঠাসবুনট

ভিক্ষুককে মুদ্রা দান করা মহত্ত্বের মতো
একে অপরের প্রসংশাপর্ব চলাকালীন আমার চোখজোড়া—

ঘোর উৎসবে ঘোরাঘুরি করতে করতে
জানালার পর্দায় আটকে যায়...

পর্দায় কারুকাজের ভাঁজ থেকে দু’একটা লতাপাতা
বড়শির মতো টেনে নিয়ে এলো—
শালুক তোলা দুপুরের হারানো সম্ভার
হুড়মুড় করে জানালা গলে ঢুকে পড়ছে জলসিক্ত অজস্র শালুক

ইতোমধ্যে আমার বাকল থেকে নিজেকে খসিয়ে নেওয়া আমি
শালুক তুলতে নেমে গেছি দুপুরের রোদে, নাকি কাদামাটিযুক্ত—
শালুকের শেকড়সহ পুরো জলাধারটাই উঠে এসেছে সভাকক্ষে—
এ অনুসন্ধান কারো কাছেই জরুরি বলে মনে হয়নি

নিমগ্ন আমি মধ্যদুপুরে স্মৃতি হাতড়ে উদ্ধার করতে থাকি
হারানো শালুকের পোড়া পোড়া ঘ্রাণ

একঝুড়ি অমর কবিতা

চৌকিতে গা গড়িয়ে নেয়া দুপুরকে
বালিশ চাপা দিতে এসে, যে-সকল শরীরি ভাঁজ
নাগরিক চাঞ্চল্য রচনায় মনোনিবেশ করে
নদী-হাওরের বেহুদা জল ও স্রোতের পায়ে
নিয়ন্ত্রিত ঘুঙুর পরাবার মহড়া দিতে থাকে;

তাদের ভাতঘুমের অবসরে কখন কোন ক্ষণে
শালুকপোড়া দুপুর নিজ অস্তিত্ব রক্ষার তাড়নায়
ছুটতে ছুটতে গিয়ে দাঁড়ায় ঐতিহ্যের খাতার দরজায়;
অনির্ণেয় সে সময়!

অথচ যথারীতি অনায়াস-নির্লজ্জতায় লাউডস্পিকারে
ওরা ঘোষণা দেয়— কতিপয় দুর্বৃত্তের অগ্নিসংযোগে
ঘুমের ভেতরে মৃত্যুবরণ করেছে শালুক ও দুপুর

তথাপি দুপুরের অনিয়মিত নিয়মে
ফলবিক্রেতার ঝুড়িতে শালুকের মাধুর্য
ঐতিহ্যের অমরতার কথাই জানান দিয়ে যায়

অন্তরিত

বন্ধ জানালার ধুলো আর রিক্ততার সব অন্ধকার
ধামাচাপা দিতে একাদশীর চাঁদ যথার্থ কিনা
সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি

শ্রাবণে অবিরাম বৃষ্টিপাত অনর্থ— এমন ভাবনা থেকে চিত্তকে
এক লহমায় টেনে নেয় প্রগাঢ় সবুজ সম্ভার; যদিও—
অরণ্যের সংসারে শেষাবধি প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন কাঠুরের ভাষা

স্বৈরশাসকের চূড়ান্ত কথার মতো
মৃত্যুই নিঃসঙ্গতার শেষ সঙ্গতি

অথচ কবিতার শেষ স্তবকে অন্তরিত প্রবলতার মতো
অযথা তাকিয়ে থাকে মেঘমাখা একরোখা চাঁদ

এখনও ভেসে ওঠে

আমার সম্ভাবনা নিয়ে দিনরাত যারা ভাবনায় বিভোর
তারা নিজেদের হতাশার মেঘের খবর রাখে না

বরাবর যেকোনো সম্ভাবনা আয়নায় বিম্বিত হতে থাকে—
দিগন্তজোড়া সবুজ, বিস্তীর্ণ বিল, শালুক তোলা দুপুর
আর তপ্ত হাওয়ায় ঝলসানো বালকের তামাটে মুখ

একদিন বালকটি গলা পানিতে চুবিয়ে থাকতে থাকতে
ডুবুরির মতো আরো গভীরে গিয়ে শালুক তুলে দেখায়
কী অভাবনীয় ঐশ্বর্যে লুকিয়ে এক একটি শালুক!

‘সব গাছে মেলে না গুটি,  জইন্মে বড় হতি সময় লাগে
দেখতি দেখতি বোঝা যায় কোন গাছে থাকতি পারে’

বালকের এমন কথায়
চর্চা বিষয়ক জ্ঞান লাভ করেছি কিনা মনে পড়ে না

এখনও সম্ভাবনার খবরে
স্নায়ুর ভেতর ভেসে ওঠে শালুক তোলা দুপুর

শিরোনামহীন

একদিন সারাবাড়ি ঘুম ছড়িয়ে দেখি
অটল ঘুমে ধীরে ধীরে আমাকে ডুবে যেতে দেখে
কোলাহল থেকে বিরতি নেয় বাতাসেরা
দৃষ্টান্ত স্থাপনে গাফিলতি দেখায় সমূহ আলো

ফড়িং প্রজাপতি পিঁপড়ে এমনকি ফুলেরাও প্রহরী হয়ে ওঠে
যেন আচমকা না ভাঙে এমন ঘনিভূত ঘুম

কত ঘুম খসে গেছে হলভর্তি পরীক্ষার্থীর বিরতিহীন লেখার শব্দে
কত ঘুমে ঘণ্টা পড়ে গেছে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছবার আগেই

হারানো ফর্মুলা ফিরে পেতে ভোরের দিকে চোখ বুজে থাকলে
আরোপিত ঘুম কি ফিরিয়ে দেয় সম্ভাব্য গাণিতিক সমাধান?

অথচ দিবারাত্র জেগে থাকি জাগতিক অংকে মগ্ন নির্বোধ পেন্ডুলাম

নির্দেশনা

সমাবেশটা ব্যাতিক্রম কিনা— তেমন কোনো ঘোষণা হয়নি

মঞ্চে আমন্ত্রিত বক্তারা গ্রহণ করেছেন শ্রোতার ভূমিকা
সমস্ত শো
শ্রোতা-দর্শক পরিণত হলেন বক্তায়
বলা যায় আরজি পেশকারী

একটু পর পর তারা ধুলোজমা ব্যথা উগরে যে মাত্রায় আহাজারি করে,
তার প্রেক্ষিতে আমন্ত্রিতদের বিমর্ষ-ধ্বনি এত উচ্চমাত্রার যে—
উনাদের স্বজনের এমনকি নিজের ব্যথাতেও এ প্রকার কাতরতা নেই

অথচ যখন গ্যালারির প্রতিটি সারির প্রত্যেকে একটি করে গল্প খুঁজে পেল,
মঞ্চে দায়িত্বরত তথাকথিত শ্রোতার কানে
উচ্চপদস্থ কমিটি থেকে আসতে লাগলো ঘুমের নির্দেশনা