
স্বাধীন খসরু
শামীম আজাদের গদ্য ‘স্বাধীন খসরু ও বিলেতে আমার নাটক’
প্রকাশিত : এপ্রিল ০৩, ২০২৫
১৯৯২ সালে লন্ডনে হাফমুন থিয়েটারের জন্য খ্যাতনামা নাট্যকার ম্যারি কুপার ও আমার যৌথভাবে লেখা ‘হপসস্কচ গোস্ট” নাটকটি দারুণ ব্যবসা করে। একশোর ওপর তা মঞ্চস্থ হয়। এতে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কোম্পানি আরেকটি নাটক লেখার জন্য অনুদান পেয়ে যায়। এতে এলো এককভাবে নাটক লেখার সুযোগ। আমার ড্রামা টার্গ ছিলেন লীন কখলীন। লীন ছিলেন আইরিশ নাটক লেখক ও প্রশিক্ষক। সে এক অদ্ভূত অভিজ্ঞতা।
খুব সম্ভবত সেটা ছিল ১৯৯৪ সাল। তিনি প্রথমত আমাকে উষ্কে দিলেন আমার পারিবারিক কাঠামো ও পরিজন তথা বাংলাদেশি জীবনযাপন ও ইতিহাস নিয়ে আমার চিন্তার জগৎটিকে। এরপর শুনলেন গল্প। কিন্তু তা সত্য জীবনের ছায়ায়। আমি গল্প বলি, লীন নোট নেন। তিনি কথা বলেন, আমি নোট নিই। আমি কখনো পাবে, কখনো থিয়েটারে আমার ছোট্ট অফিসে, কখনো ঝরা ব্লসমে ব্লসমে গোলাপি মাঠে বসে।
আমি আমার ধারণায় নাটকের ফিজিবিলিটি বুঝে নিই। তখন আমরা কথায় কথায় সিমাস হেইনীর কবিতা বলতাম। আর আমাদের বাংলাদেশের চাষের সঙ্গে এদের আলু তোলা সমিল মনে হয়। সিমাসের পিতার রূপকল্প ও আমাদের প্রপিতামহ এক হয়ে যায়। আমার মাথায় গেঁথে যায় ‘ডিগিং’। অবাক হয়ে ভাবতাম, বিলেতে আসা আইরিশ অভিবাসী ও তাদের সভ্যতার সঙ্গে আমাদের কত মিল! ওদেরও মহা বৃষ্টিপাত হয়। ওরা আমাদের মতো ভূতে বিশ্বাস করে। উচ্চস্বরে গান করে… শুধু পানে মিল নেই।
নাট্যকার হিসেবে এ আমার ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় নাটক। নাম ছিল ‘দি রাফ’। ভেলা। বন্যাতে আটকে পড়া তিনজন মানুষ ও একটি সাপের গল্প। চারস্থানের চারটি প্রাণীর একটি মাচায় অবস্থান ও ভেলা দিয়ে উদ্ধারের গল্প। গ্রামীণ এক পরিবারের পিতামহী, ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে হলিডেতে যাওয়া স্কুল ছাত্র সাদেক ও কলিম নামের রাখাল ছেলে (যার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়। মা ক্যান্সারে মারা যাওয়ায় পড়াশোনা বন্ধ। সে সন্দীপের গাছুয়ায় চাচাদের গরুর পালের দেখাশোনা করে। এবং চতুর্থ চরিত্র কঞ্চি নামের এক সাপ। বন্যায় সবাই একই গাছে আশ্রয় নেয়। এবং শেষ পর্যন্ত ভেলা বানিয়ে উদ্ধার পায়।
হ্যাঁ বাইলিংগুয়াল এ নাটকটিতে তুলে ধরি বাংলাদেশের চালচিত্র। ‘ভেলা’ ছিল সম্পূর্ণ দ্বিভাষিক, ইংলিশ-বাংলায় লেখা নাটক। পুরোটা প্রথমে ইংরেজিতে লিখে পরে তাতে বাংলা ঢোকাই। সে এক অভিনব অভিজ্ঞতা। আরেকদিন বলব। এর অন্যতম কলিম চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বাংলাদেশের টিভি নাটক বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের বিখ্যাত অভিনেতা স্বাধীন খসরু। স্বাধীন যখন বিলেতে নাট্যাভিনয় শিক্ষাপ্রাপ্ত দেশপ্রেমিক টগবগে তরুণ। আমার সঙ্গে তার প্রথম দেখা ১০ ডাইনিং স্ট্রিটের সামনে ১৯৮৯ সালের বন্যা নিয়ে সহায্যের জন্য শ্লোগান দিতে দিতে।
সে সেপ্টেম্বরে আর আমি মাত্র কদিন হলো চাকরি নিয়ে শীতার্ত লন্ডনে পা রেখেছি। এটিও ছিল এক বিরল অভিজ্ঞতা। দেশের দূর্যোগে হাজার মাইল দূরের মানুষ কত কী না করে! প্লাকার্ড হাতে আমরা গুটিকয় বাঙালি ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিলাম। এমন সময় সুদর্শন এক তরুণ আমার ও আজাদের জন্য চা আনবে কিনা জানতে চাইল। তার গায়ে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা টি শার্ট। আর যে যে অঞ্চল বন্যা প্লাবিত হয়েছে তা সে কালো ফেল্টপেনে কালো করে দিয়েছে। ছেলেটির মায়াভরা চোখ, ঝাঁকড়া চুল। কথায় কথায় জানলাম ওর নাম খসরু।
বাংলাদেশের ৭১ তার কাছে এমন গুরুত্ববহ যে তারুণ্যে টগবগে এ তরুণ দেশ স্বাধীন হলে নাম পাল্টে আইনি প্রক্রিয়ায় নাম নেয় স্বাধীন বলে। সব শুনে আমি ডাউনিং স্ট্রিটের উল্টোদিকের ফেন্স ধরে বিস্ময়ে ও শ্রদ্ধায় তার দিকে তাকিয়ে থাকি। সেই তরুণ্যেই এমনই দেশ প্রেম যে, জীবনের দিক পাল্টে একসময় সে দেশেই চলে যায়। পরিচিত হয় হুমায়ূন ত্রয়ীদের একজন ‘বৈদেশী’ বলে। আহ... কত স্মৃতি কত গান!
আমার নাটকের নির্দেশক ছিলেন থিয়েটার স্ট্রাটফোর্ড খ্যাত পরিচালক স্টিভ মফিট। নাটকটি অর্ধ শতাধিক শো করে। স্বাধীন ছাড়া বাকি তিন অভিনেতা, নির্দেশক, ডিজাইনার, সংগীত নির্দেশক কেউ বাংলাভাষী ছিলেন না। নাটকের শুরু ছাড়া বাকিটুকুর ৮০% ইংরেজি। নৃত্য ও গীত ছিল ভারতীয় ঘরানার। শুরুটা পড়লেই বুঝে যাবেন ইংলিশ-বাংলা নাটকগুলোর মজা ও চ্যালেঞ্জ। এখানে নাটকের শুরুটা বাংলায় লিখে দিলাম। অনেকটা আমাদের দেশের লোক ঘরানার বন্দনা স্টাইলে নাটকটি শুরু করি এভাবে:
অল মাইটিভি আল্লার নামে করি নিবেদন
চিলড্রেন আর অ্যাডাল্ট এবং যত সভাজন
অন দা নর্থ স্যালুট করি পীর পয়গম্বর
আরও করি বে অফ বেঙ্গল-বঙ্গপোসাগর।
টাইনি ভিলেজ সুন্দর মুন্দর নাম মূসাপুর
লিলি শালুক ফুটিয়া ওঠে বর্ষার পুকুর
ইস্ট অ্যান্ডে ফিসিং পাড়া ফ্লাই ভন ভন করে
সন্ধ্যা হলে লণ্ঠন জেলে শুকানি গান ধরে।
মনসুনের শেষে ভাঙলে ছেলেবুড়ার ঘুম
রাজা সাইল ফ্লেভার আর কেক পিঠার ধুম
অ্যান্ড অফ দ্য হরাইজন নীল সাগরের বাঁশি
কখনো ডিভাসটেটিং কিংবা অবিনাশী।
টেলিং ইউ দ্য স্টোরি অ্যাবাউট ফ্যান্টাসটিক ফোর
কঞ্চিসাপ, কলিম, সাদেক আর দাদির মূসাপুর।
লেখক: কবি