এহসান হাবীবের গদ্য ‘কবির স্বভাব কবির অভাব’

প্রকাশিত : এপ্রিল ০১, ২০২৫

আমি তখন স্নাতকে পড়ি। সম্ভবত ২য় বর্ষ। একদিন আফজাল স্যার ডেকে বললেন, বিভাগের দরিদ্র তহবিল হতে ছাত্রদের টাকা দেবে, তুই একটা আবেদন করো।
আমার কেমন জানি লাগলো, বললাম স্যার, আমি গরিব এইটা ঘটা করে মানুষকে জানানোর কী আছে? আর গরিব হইলেই আমার দরিদ্র তহবিলের টাকা তুইলা খাইতে হবে?

স্যার আর কিছু বলে নাই। কিন্তু এই জিনিসটা আমি সবসময় মেনে চলার চেষ্টা করছি। আমার গরিবানা আমার অভাব আমি কোনোদিন কাউরে বুঝতে দেয় নাই। এইটা বোধহয় আমার কবির স্বভাব ছিল।

লোকজনের ধারণা, এমনকি আমার মা, আত্মীয়-স্বজন তাদের প্রত্যেকের ধারণা, আমার বোধহয় প্রচুর টাকা-পয়সা আছে। খামাকা লোকজনকে দোষ দিয়া লাভ নাই। আমি নিজেও টের পাই, আমার চলন বলন, আমার লাইফ স্টাইল এইটা সাক্ষ্য দেয় যে, আমার প্রচুর টাকা আছে।

আমি দেখছি, যারা মাসে লাখ টাকা ইনকাম করে তারা সারাদিন টাকা কেমনে ধইরা রাখা যায়, নিজেরে, নিজের স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়-স্বজনকে বঞ্চিত করে টাকা জমানোর চেষ্টা করে। বাড়ি বানায়, ব্যাংকে সঞ্চয় করে, আর ফকিন্নির মতো জীবন যাপন করে।

এইটা আমি বেশি দেখছি আমার চাকরিজীবী কলিগদের ক্ষেত্রে। তারা পড়ায়া, চাকরি কইরা বেশ ভালো টাকা ইনকাম করে আর বাজার করে একটু নরম হয়ে যাওয়া মাছ, যেইটা একটু সস্তায় পাওয়া যায়, একটু পচে যাওয়া সব্জি, বাচ্চাদের মুখের দিকেও থাকায় না মাস শেষে তাকায় ঘরের বিভিন্ন চিপাচাপার দিকে যেখানে বেতনের বা ইনকামের টাকাটা লুকায়া রাখা যায়।

তো এই কিসিমের মানুষের আমার প্রতি বিরাট অভিযোগ, আমি কেন কোটিপতির মতো চলি? নারে ভাই, আমি কোটিপতির মতো চলি না। আমি শুধু আমার অভাব অন্যদের কাছে বলি না। আমার অভাব আমি নিজের কাছেই রেখে দেই। নিজে পূরণ করার চেষ্টা করি। আমার চাহিদা তো অল্প।

মানুষজনের মতো বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক ব্যালান্সের রাক্ষুসে চাহিদা আমার নাই। সঞ্চয়ের খেয়াল নাই। চিরকাল আমি বিশ টাকা ইনকাম করলে পঁচিশ টাকা খরচ করার মানুষ। বাকি পাঁচ টাকা আমি ঋণ করি। ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড আমারে সেই সুবিধা দিয়া রাখে। আমি গণ পরিবহনে চড়ি না। এর পেছনে অন্য কারণ আছে, আমার খুব ভয়ংকর অ্যালার্জির সমস্যা আছে।

মানুষের ঘাম, হাঁচি-কাশি এমনকি শরীরের ঘ্রাণ থেকেও আমার অ্যালার্জি হয়। আমি কোথাও গেলে একটু পরিষ্কার পরিছন্ন আর আরামদায়ক পরিবেশে থাকতে ভালোবাসি। আমার শারীরিক অন্যান্য সমস্যা আছে, আমার পায়ে, বিশেষ করে নার্ভে খুব মারাত্মক সমস্যা নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াই। ফলে আমার ঘুমের জন্য একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা মেইনটেইন করতে হয়ে, নোংরা বাথরুমে গেলে দুর্গন্ধে আমার কাশি আসে সেই কাশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

ফলে কোথাও গেলে আমাকে এগুলো মেইনটেইন করতে হয়। এগুলো আমার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। ফলে আমি ভালো হোটেলে খাই, থাকি, ঘুমাই এবং বাথরুম করি। আপনারা এগুলো দেখে আমাকে বিচার করেন আমার চলন বলন কোটিপতির মতো। কিন্তু আপনারা যেটা দেখেন না যে, সেটা হলো আমার কাছে পর্যাপ্ত পয়সা না থাকলে আমি সাধারণত কোথাও যাই না। আমি আমার ঘরেই থাকি।

কিন্তু কারো কাছে নিজের জন্য হাত পাতি না। যখন একলা ছিলাম মানে আমি সংসার করি নাই তখনো আমার অভাব ছিল। এমন দিন গেছে আমি সারাদিন ভাই খাইতে পারি নাই টাকার অভাবে। আমার মনে আছে, একদিন আমি সারাদিন কিছু খাই নাই। কারণ বাজার ছিল না। ঘরে দিন দুযেক আগের কেনা একটা কামরাঙা ছিল। আমি ক্ষুধার্থ পেটে কামরাঙা খাইছি। তারপর বমি করছি।

আমি হাত পাতলেই টাকা পাইতাম। কিন্তু হাত পাতার স্বভাব আমার ছিল না বলে আমি ক্ষুধার কষ্ট করছি। শুধু টাকা নয়, আমি প্রেমের অভাবও কাউরে কোনোদিন বলতে যাই নাই। আমি যেমন দুই হাতে টাকা খরচ করি তেমনি প্রচুর মেয়ে মানুষের সঙ্গেও মিশছি। কিন্তু কোন মেয়েকে হ্যাংলামো করে নিজের প্রেমের অভাবের কথা বলছি, এইটা কেউ বলতে পারবে না। এইজন্যই বোধহয় মেয়েরাও আমাকে অহংকারী ভেবে রাগ করে দূরে চলে গেছে।

তারা কেউ কেউ আমাকে পরবর্তীতে শত্রুজ্ঞান করছে। নারে ভাই, এইটা অহংকার নয়, এইটা  হাত পেতে না নেয়ার স্বভাব। যেই স্বভাব আমারে কবি বানাইছে। আমার যখন চাকরি গেল তখন আমাদের দুই বাচ্চা, নোয়ামনি আর আদ্রিতা। যেহেতু আমার টাকা জমানোর অভ্যাস ছিল না আমি একেবারে অকুল পাথারে পড়ে গেলাম। কী করবো ভেবে দিশেহারা!

আমার এমন দিনও গেছে, আমার কাছে বাজারের পয়সা পর্যন্ত নাই। পরদিন সকালে আমি বাজার করবো কীভাবে এটা ভেবে আমার রাতে ঘুম হতো না। আমি আমার মেয়েদেরকে ঘুণাক্ষরেও অভাব টের পাইতে দেই নাই। আমি বরং তখন ওদের নিয়ে বড় বড় পার্টি দিছি। আমি বাজারে গেলে মানিব্যাগ ভর্তি করে টাকা নিয়ে যাই, এইটা আপনারা দেখেন কিন্তু আপনারা দেখেন না যে, মানিব্যাগ ভর্তি টাকা না থাকলে আমি বাজারেই যাই না।

আপনারা আমার বাজারে যাওয়াটা দেখেন কিন্তু বাজারে না যাওয়াটা আপনারা খেয়াল করেন না। আপনারা দেখেন, কেউ আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাদের ফিরাই না। কিন্তু আপনারা দেখেন না যে, তাদেরকে দেয়ার পর আমার মানিব্যাগ শূন্য হয়ে যায় এবং শূন্য মানিব্যাগ নিয়ে আমি দিনের পর দিন ঘরে বসে থাকি। আমার চরম দুঃসময় যখন আমার কোন ইনকাম ছিল না তখন আমার মা আর বোন মিলে লাখ লাখ টাকার জমি কিনছেন, জমি বেচছেন, তারা আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করে নাই আমার কোনো সাহায্য লাগবে কিনা?

আমি বললে তারা অবশ্যই সাহায্য করতেন। কিন্তু ওই যে, মানুষের কাছে চাওয়ার অভ্যাস করি নাই যে! ওই সময় আমার অফিসের কোনো কোনো কলিগ যারা আমার অধীনে চাকরি করতেন তাদের কয়েকজন আমার কাছে টাকা নিয়ে এসেছিলেন, খুব বিনয়ের সাথে বলেছে, স্যার আপনার খুব খারাপ সময় যাচ্ছে আমরা কয়েকজন মিলে আপনার জন্য সামান্য টাকা নিয়ে এসেছি, আপনি যদি রাখতেন।

নেহাতেই কম টাকা ছিলে না। আমার কয়েক মাসের বাজার হয়ে যেত। কিন্তু আমার স্বভাব ওই টাকা আমাকে গ্রহণ করতে দেয়নি। মনে আছে, ইসমাঈল আর আরিফকে আমি বলেছিলাম, তোমরা আমাকে সাহায্য করতে এসেছো, আমি খুব খুশি হয়েছি, আপাতত আমার টাকার দরকার নাই, দরকার হলে আমি তোমাদের বলবো। অথচ ওই শুক্কুরবার সকালে আমার বাজারের পয়সা ছিল না।

লেখক: কবি